সামষ্টিক সূচক নিয়ে স্বস্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক


শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্যই সফল হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমানোর তাদের আপ্রাণ চেষ্টার ফলোদয় হয়েছে। গত জুন মাসের তুলনায় এ বছরের জুনে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে। একই সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে। তবে গত বছরের তুলনায় বেড়েছে রপ্তানি আর রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচক নিয়ে স্বস্তিতে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, অত স্বস্তির কিছু নেই। মূল্যস্ফীতি এখনো কমেনি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহও বাড়েনি। নতুন করে যোগ হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি। সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে বলেই তাঁদের ধারণা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, বেসরকারি খাতকে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার আঁচ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে মুদ্রানীতি নমনীয় করার ফলে দেশের সামষ্টিক সূচকগুলো অস্বস্তিকর অবস্থানে চলে গিয়েছিল। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের। ফলে মন্দাত্তোর পরিস্থিতিতে এর লাগাম টেনে ধরতে সচেষ্ট হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেশ কয়েক দফা বাড়ানো হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদসহ রেপো ও রিভার্স রেপোর হার। একই সঙ্গে বাড়ানো হয় ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণের পরিমাণও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো এখন স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে।
পুঁজিবাজারে মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে ব্যাংকগুলো এমনিতেই চাপের মধ্যে ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ির কারণে ঋণ বিতরণে তারা আগের চেয়ে বেশি সতর্ক হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ১৩ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এর পর থেকে তা বাড়তে শুরু করে ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে প্রায় ১৯ শতাংশে উন্নীত হয়। এ অবস্থান থেকে ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে ২০১০ সালের জুন মাসে তা ২৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ডিসেম্বরের মধ্যেই ২৮ শতাংশের কাছাকাছি পেঁৗছে যায়। চলতি ২০১১ সালের মার্চ প্রান্তিকে এসে ২৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। প্রায় দুই বছর ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি ধারায় থেকে অবশেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণের কারণে চলতি বছরের জুনে নিম্নমুখী হয়। জুনভিত্তিক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, জুন শেষে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ২৫.৮৪ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে তা ২৫.৫ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। 'ব্রড মানি'-এর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে তা প্রায় ১৭ শতাংশে নেমে আসে। পরবর্তী মাস থেকেই তা ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং ওই বছরের ডিসেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ২১ শতাংশে পেঁৗছে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে যা প্রায় ২৩ শতাংশের কাছাকাছি পেঁৗছে এবং চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে এসে তা সর্বোচ্চ ২৩.৫ শতাংশ হয়। জুন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, এটিও নিম্নমুখী ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। জুন শেষে তা ২১.৩৪ শতাংশে নেমে আসে।
'অভ্যন্তরীণ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি'-এর ক্ষেত্রেও অনুরূপ পরিস্থিতি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে তা প্রায় ১২ শতাংশ থেকে বাড়তে শুরু করে ডিসেম্বরে তা প্রায় ১৪ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০১০ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৯ শতাংশে এবং ডিসেম্বরে তা ২৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। চলতি ২০১১ সালের মার্চ প্রান্তিকে এসে তা সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশে পেঁৗছে এবং জুন শেষে তা কমতে শুরু করে ২৭.৪১ শতাংশে পেঁৗছে।
গত বছরের জুনে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪১.১৬ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২.২৮ শতাংশে। একই সঙ্গে বেড়েছে রপ্তানি। গত বছরের জুনে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ২৬.৪০ শতাংশ, চলতি জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে। সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিমাণও বেড়েছে। গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২০.৮৮ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪.৪১ শতাংশে।
অনুপাদনশীল খাতে ঋণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টার অংশ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিকবার রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদ হার বৃদ্ধি করে। চলতি বছরই রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদ ০.২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতের সুদ হার বাড়াতেও ব্যাংকগুলোকে উৎসাহী করে। এর ফলে ব্যাংক খাতের বাইরে থাকা অর্থ ব্যাংকের হাতে আসতে শুরু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক তার দায়িত্ব সঠিকভাবেই পালন করছে। দেশের অর্থনীতিও সঠিক পথেই এগোচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোও স্বস্তিকর অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রাখার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার তদারকি ব্যবস্থা কঠোর করেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণের পরিমাণ, রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদ হার বাড়ানোসহ সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কারণে হয়তো সাময়িকভাবে এ সূচকগুলো নিম্নমুখী ধারায় ফিরেছে। তবে আরো কয়েক মাস দেখলে বুঝা যাবে প্রকৃতপক্ষেই স্বস্তির দিকে যাচ্ছে কি-না। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি এ সূচকগুলোর বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে তারল্যের চাপও হয়তো এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালন করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ-আমানত অনুপাত কমিয়ে এনেছে। এর ফলেও সূচকগুলো নিম্নমুখী হয়ে থাকতে পারে। তবে আরো দুই-এক মাস গেলে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে বলে তিনি মনে করেন।
যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে, এর চেয়ে আর বেশি কিছু করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিল না বলে মনে করেন সাবেক এই গভর্নর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে মুদ্রানীতি নিয়েছে তা যথার্থ। তবে এসব সূচক ভবিষ্যতে নিম্নমুখী ধারায় থাকবে কি-না, তা নির্ভর করে অর্থবছরের রাজস্ব পরিকল্পনার (ফিসক্যাল পলিসি) ওপর। ফিসক্যাল পলিসি যদি সম্প্রসারণমূলক হয়, তাহলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি কতটাই বা কমানো সম্ভব! মুদ্রানীতি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সরকারকেই করে দিতে হবে। নতুন ব্যাংক দিতে হবে, পুঁজিবাজারে ঋণের জোগান দিতে হবে_এ ধরনের সিদ্ধান্ত যদি সরকার আগে থেকেই নিয়ে নেয়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী-ই বা করার থাকে! স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য এ মুহূর্তে তিনি মুদ্রানীতির চেয়ে সরকারের সহযোগিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখ্ত বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মধ্যেই রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমেনি, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহও সেভাবে বাড়েনি। বিদেশি অর্থায়নে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হারও যদি না বাড়ে, তাহলে গত বছর যেসব সমস্যা হয়েছিল, এবারও সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তা ছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, কে জানে! এবার আগেই যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, আমনের মৌসুমে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হলে ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এসব কিছু বিবেচনায় সামষ্টিক অর্থনীতি যে স্বস্তিতে আছে, তা বলা যাবে না।
http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Internet&pub_no=614&cat_id=1&menu_id=24&news_type_id=1&index=1  

Comments