সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এ তসলিম ‘বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি মন্দা দেখা দেয়’

রথম আলো: আমেরিকার অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ কী?
এম এ তসলিম: সহজভাবে বললে, সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের তুলনায় সঞ্চয় অনেক কম হওয়ায়। সঞ্চয় কম হওয়ায় বিনিয়োগের জন্য অব্যাহতভাবে ঋণ করতে হয়। আর ঋণ করলে ঋণ পরিশোধের দায় তৈরি হতে থাকে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বহু বছর ধরে ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের বাজেট ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছিল। একটা পর্যায়ে গিয়ে এমন অবস্থা দেখা দিল যে, বেড়ে চলা ঘাটতি দেশটির ঋণের বোঝা বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে ঘাটতিতে সীমা আরোপ করে আমেরিকা। তবে সর্বশেষ এ সীমা নির্ধারণ নিয়ে এ জন্য ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য প্রেসিডেন্ট ওবামা একটা আপসরফা করতে পারেন ঋণসীমা নিয়ে। তা না হলে আমেরিকা আর ঋণ নিতে পারত না। ফলে বিরাট সংকট দেখা দিত। আপাতত সেই অবস্থা রোধ করা গেছে। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।
প্রথম আলো: নেতিবাচক প্রভাবটা বিশ্ব অর্থনীতিতে কীভাবে পড়তে পারে?
এম এ তসলিম: ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারে বিশেষত, শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেননা, আমেরিকা যদি ঋণ করতে না পারে, তাহলে তার আগে গৃহীত ঋণ ফেরত দেওয়ায় সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এতে করে ঋণদাতা দেশগুলোও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে বাধ্য। এর নেতিবাচক প্রভাবটা এশিয়ার ওপর বেশি পড়ার শঙ্কা এ জন্যই যে, এশিয়ার দেশগুলোই কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলতি হিসাবের বিরাট ঘাটতি অর্থায়ন করে আসছে। চীন, তাইওয়ান, ভারত প্রভৃতি দেশ প্রচুর পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড কিনেছে বা এই বন্ডে বিনিয়োগ করেছে।
আসলে যতক্ষণ পর্যন্ত না যুক্তরাষ্ট্র সঞ্চয় বাড়াবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সংকট থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব হবে না। তবে সঞ্চয় বাড়ানো কঠিন। অন্যদিকে এখন এই ঘাটতি সংকটের ফলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলার আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। যেহেতু বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যই মার্কিন ডলারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, সেহেতু ডলার ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকলে বিভিন্ন দেশের আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
এম এ তসলিম: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ঘাটতিজনিত যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা আপাতত বাংলাদেশের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। তবে এই সংকট যদি দেশটিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে অনিবার্যভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত আসবে। বিগত দুটো মন্দার সময়ই আমরা দেখেছি যে, বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় ধরনের আঘাত এসেছে। ২০০১ সালে ‘৯/১১’ সন্ত্রাসী ঘটনার পর আমেরিকায় যখন মন্দা দেখা দেয়, তখন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের পর অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কেননা, মন্দা দেখা দিলে চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে গেলে পণ্যের জোগানও কমে যায়। আর যদি আগামী দিনে আমেরিকায় কোনো মন্দা দেখা না দেয়, তাহলে হয়তো বাংলাদেশের জন্য তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
প্রথম আলো: যুক্তরাষ্ট্রের এই সংকট থেকে বাংলাদেশের কী কিছু শিক্ষণীয় আছে?
এম এ তসলিম: অবশ্যই আছে। এটা হলো, আয় থেকে ব্যয় বেশি হতে থাকলে তা বিপদ ডেকে আনে। সম্প্রতি আমরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেমন গ্রিস, স্পেন, আয়ারল্যান্ডে এই সংকট দেখেছি। আমেরিকা এতদিন পর্যন্ত বড় ধরনের ঘাটতি নিয়েও টিকে আছে এ কারণে যে তারা তাদের নিজেদের মুদ্রা (ডলার) বিক্রি করতে পারে যা অন্যরা পারে না। তবে এই করেও যে শেষ রক্ষা হয় না, এবার তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের জন্য শিক্ষা হলো, ঘাটতির ব্যাপারে সতর্ক থাকা। বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ছে। চলতি হিসাবের ভারসাম্যও ঘাটতির দিকে যাচ্ছে। গত অর্থবছরের মে পর্যন্ত উদ্বৃত্ত থাকলেও তা অনেক কম। হয়তো জুন শেষে সামান্য উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকই হিসাব করেছে যে, চলতি অর্থবছর এই ঘাটতি ১০০ কোটি ডলার হতে পারে। এসবের প্রভাবটা তাৎক্ষণিক হবে না। কিছুদিন পরে গিয়ে দেখা যাবে। তখন আন্তর্জাতিক ঋণমানে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে যাবে। এমনিতেই গত বছর বিদেশি সাহায্যপ্রবাহ অনেক কমে গেছে। বরং ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে যেটুকু বিদেশি সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে আগের ঋণ পরিশোধ করতে। সুতরাং আমরা এই চক্রের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। অন্যদিকে প্রবাসী-আয়ের প্রবৃদ্ধিও তেমন জোরালো নয়। ভবিষ্যতে জনশক্তি রপ্তানি পরিস্থিতি কী হয়, তার ওপর নির্ভর করছে এই প্রবাসী-আয়ের প্রবৃদ্ধি। বিদেশি বিনিয়োগও খুব আসছে না। আবার জনসংখ্যার যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, তাতে করে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে যাবে। এটা সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ বা অনুদান পাওয়া কঠিন করে দিতে পারে।

Comments