খাদ্যে মূল্যস্ফীতির রেকর্ড ১৩.৪০

মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ছেই। দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে আরও একদফা। এতে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় আরও বেড়ে গেল। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ। কারণ, গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির হার শহরের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে গতকাল। এতে দেখা গেছে, পয়েন্ট টু পয়েন্ট অর্থাত্ আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গ্রামে এই হার ১১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। বিবিএস’র হিসাবে বাংলাদেশের একজন মানুষ আয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশ ব্যয় করে খাদ্য কিনতে। ফলে খাদ্যের মূল্য বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। বিবিএস জুলাইয়ে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড করেছে ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা গ্রামে ১৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির অর্থ হচ্ছে, আগে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকার প্রয়োজন হতো, সেই একই পণ্য কিনতে এখন দরকার পড়বে ১১০ টাকা ৯৬ পয়সা। একজন মানুষের এই পরিমাণ আয় যদি না বাড়ে, তাহলে তাকে এখন আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, অর্থনীতির জন্য কিছুটা মূল্যস্ফীতি থাকা ভালো হলেও, এর হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে তা দরিদ্র মানুষকে চরম কষ্ট দেয়। কারণ, এসব মানুষের আয় একই হারে বাড়ে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে, মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়াটাই বিপজ্জনক। এর ফলে দারিদ্র্যের প্রকোপ বাড়ে।
এবারের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিসহ নানা উদ্যোগ আয়োজনের কথা বলেছিলেন। তবে অর্থবছরের প্রথম মাসেই (জুলাইয়ে) মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫১ শতাংশ। জুনে গ্রামেও মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ের তুলনায় কম ছিল।
বিবিএস’র সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি যানবাহন ও যোগাযোগসহ খাদ্যবহির্ভূত কিছু খাতেও ব্যয় বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। শহর থেকে গ্রামে মূল্যস্ফীতির প্রকোপ বেশি।
চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ, রসুনসহ বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে দেশের সাধারণ মানুষ এখন মূলস্ফীতির ফাঁদে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা আভাস দিয়েছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যমূল্য না কমলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। আর এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ওপর বাড়তি চাপ ফেলবে মূল্যস্ফীতি।
বিবিএসের উপাত্ত অনুসারে, শহর এলাকার তুলনায় গ্রাম এলাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি পরিলক্ষিত হয়। গত জুলাইয়ে গ্রামে যেখানে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, সেখানে একই সময়ে শহরে এই হার হয় ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একইভাবে গ্রামে খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার জুলাইয়ে ১৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে শহরে এই হার হয়েছে ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ। এতে বোঝা যায় যে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকে খাদ্যের জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান দৈনিক আমার দেশকে বলেন, বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে দ্রব্যমূল্য লাগামহীনভাবে বেড়ে গেছে। এ অবস্থা বজায় থাকলে মূল্য পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ অতিক্রম করলেই এর কারণে পরবর্তীতে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিশেষ করে খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় গরিব ও স্থির আয়ের মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে মন্তব্য করেন ড. আকবর আলি। স্বল্প আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান সাবেক এ উপদেষ্টা। তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়েছে আগেই। এখন তা আরও বাড়ছে। এটা হতাশাজনক। বর্তমান সময়ের মতো ভবিষ্যতেও যদি মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশের বেশি চলতে থাকে তাহলে এই মূল্যস্ফীতি নতুন মূল্যস্ফীতি টেনে আনবে। এটা এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে গরিব মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাবে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি দেশে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা টেনে আনতে পারে।
পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ শতাংশ। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ফখরুদ্দীন ও মইন উদ্দিন সরকারের আমলে তা বেড়ে হয় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মাথায় ২০০৯-১০ অর্থবছরে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের ব্যাপক মূল্য বৃৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মূল্যস্ফীতি।
পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরের সার্বিক মূল্যসূচক ছিল ১৯৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ সময় খাদ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্যদ্রব্যের মূল্য ভয়াবহভাবে বাড়ার কারণে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ২৮ শতাংশে। তখন গ্রামাঞ্চলে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তখন গ্রামে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ, খাদ্য বহির্ভূত পণ্যে গ্রামে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ সময়ে শহরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে স্ফীতি ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। আর খাদ্যদ্রব্যে শহরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসের জন্য যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে তাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমানোর ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান জানিয়েছিলেন, ঋণের প্রবৃদ্ধি কমানো হলে মানুষের হাতে টাকার সরবরাহ কমবে। আর এতেই কমে আসবে মূল্যস্ফীতির হার। তবে বাস্তবে মুদ্রানীতির এ কৌশল কোনোই কাজে আসছে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

Comments