দ্রব্যমূল্য ও লেনদেনের ভারসাম্য নিয়ে চিন্তিত অর্থমন্ত্রী
দ্রব্যমূল্য সহনশীল পর্যায়ে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা দেশের প্রধান দুটি ঝুঁকি বলে চিহ্নিত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।অর্থমন্ত্রীর মতে, ঝুঁকির তালিকায় এর পরের অবস্থানেই রয়েছে দেশে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না থাকা, বাজেট ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট। তবে এগুলো ছোট ঝুঁকি বলে মনে করেন তিনি।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চপর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মন্দা মোকাবিলায় যে টাস্কফোর্স গঠন করেছিলাম, তাতে ভালো কাজ হয়েছিল। এই টাস্কফোর্স বাতিল করে নতুন একটা গঠন করব আগামী মাসেই।’
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) আয়োজিত ‘দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন। এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদ এতে সভাপতিত্ব করেন।
মতবিনিময় সভাটি সার্বিক অর্থনীতির ওপর আয়োজন হলেও বেশির ভাগ বক্তব্যই এসেছে কর কমানোসহ সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন দাবি আদায়সংক্রান্ত।
সভায় এ কে আজাদ প্রস্তাবিত বাজেটে ঘোষিত সাত শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার অর্জনে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে ১৪টি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে হচ্ছে নতুন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনা শর্তে বিদ্যুৎ সংযোগ, সহজ ও সুলভে ঋণপ্রাপ্তি, ব্যাংক সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, বার্ষিক অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় যৌক্তিক করা, বৈদেশিক ঋণের যথাযথ ব্যবহার, রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনা, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা গড়ে তোলা, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা, সব নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কার্যকর করা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে পিপিপির আওতায় আনা, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও আমদানি শুল্কে বিদ্যমান সমস্যা নিরসন করা ইত্যাদি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুহিত বলেন, দেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছেন কৃষক। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন শ্রমিক, আর তৃতীয় হলেন উদ্যোক্তা। এই তিন শ্রেণীই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। আড়াই বছর যেভাবে চলেছি, অন্তত আরও দেড় বছর সেভাবে চলা উচিত। আগামী দেড়টি বছর স্বস্তি চাই। অথচ আমরা এখনই নির্বাচনের চিন্তা শুরু করেছি। অস্থিতিশীলতা থাকলে দেড় বছরেই ২৫ বিলিয়ন ডলারের (এক লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হয়ে যাবে।’
বিরোধী দলের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৮১ সাল থেকে শুরু হয়ে ৩০ বছরে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক আজ বাংলাদেশ। কেউ কি ভেবেছিল, তা সম্ভব হতে পারে? আরও দেড়টি বছর কাজ করতে দিন।’
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিরোধী দলের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিরাট সমস্যা কি তত্ত্বাবধায়ক সরকার? ১৮ আগস্ট সংসদ বসবে। সেখানে এসে কথা বলুন। নির্বাচিত হয়ে এসেছেন সংসদে যাবেন বলে। অথচ যাবেন না। এভাবে তো রাজনীতি করা যায় না। অন্তত চারটি বছর কাজ করতে দিন, পঞ্চম বছরে গিয়ে নির্বাচনের কথা বলুন।’
গ্যাসখাত নিয়ে বাহাদুরি করার অবস্থান নেই—এ কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, তবে বিদ্যুতে আশার আলো আছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরকার পড়বে না। বরং নতুন যোগ হবে আড়াই হাজার মেগাওয়াট।
শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যাঁরা বিনিয়োগ করছেন, তাঁরা বিনিয়োগকারী নন। কেউ যদি আশা করেন যে, প্রত্যেক দিন দাম বাড়বে, তাহলে তাঁর মতো পাগল লোক আর কেউ নেই।’
বর্তমান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বলেন, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) আগের সরকার দুর্বল করে দিয়ে গেছে। আড়াই বছরে বর্তমান সরকার এটাকে কিছুটা শক্তিশালী করতে পেরেছে।
বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি উল্লেখ করে ফারুক খান জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন আইন সংশোধন হচ্ছে। কারণ সরকার চায় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। তিনি বলেন, দেশে আমদানি বেড়েছে, কারণ খাদ্যপণ্য ও মূলধনি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে।
আলোচনা: আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘দেশে আরও ব্যাংকের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় জনগোষ্ঠীর তুলনায় আমাদের ব্যাংকের শাখা কম। ব্যাংক বেশি হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। বাজারই ঠিক করে দেবে সুদের হার কত হবে।’
রাজনৈতিক কারণে দেশের কয়লা উত্তোলন না করায় সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। আর আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে। তাঁরা কাদের স্বার্থে কাজ করেন জানি না।’
ফরাসউদ্দিন আরও বলেন, ‘দেশে রাজনীতি ও অর্থনীতির সহাবস্থান রয়েছে। তবে দুঃখের বিষয়, অর্থনীতিকে গৃহভৃত্য বানিয়ে রেখেছে রাজনীতি।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনীতি হয়ে গেছে ব্যবসা, আর ব্যবসা হয়ে গেছে রাজনীতি। রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি হয় ব্যবসা করা, তাহলে তো ব্যাপারটি খুবই খারাপ হয়ে যায়। রাজনৈতিক অর্থনীতিকে সুস্থ করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো কিছু হবে না বলে মনে করেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, কালোবাজারি ও মজুতদারদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দেখা যায় না। সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া শেয়ারবাজারে কারসাজির সঙ্গে যুক্তদেরও না। বরং তদন্ত কমিটির প্রধানদের হেস্তনেস্ত হতে হয়। তিনি বলেন, কালোটাকাকে কাজে লাগানোর যুক্তি থাকলেও তা যেন এমন না হয়, বৈধ উপার্জনকারী ব্যক্তিরা কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হবেন।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘পাকিস্তান, ভারত, চীন ইত্যাদি দেশ বস্ত্র খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, অথচ বাংলাদেশ এ ব্যাপারে নীরব।’
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। আর হলো বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা। এই দুটি ঠিক না করতে পারলে দেশ গভীর সংকটে পড়বে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর কম খাওয়ার পরামর্শের প্রসঙ্গটি তুলে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক হেলালউদ্দিন বলেন, ‘রমজান মাস। সামনে ঈদ। বস্ত্রের দাম বাড়বে। বস্ত্রমন্ত্রী কি এখন বলবেন, এক বেলা বস্ত্র পরবেন না?’
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মেট্রো চেম্বারের সভাপতি আমজাদ খান চৌধুরী, সার্ক চেম্বারের সভাপতি আনিসুল হক, বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি সেলিম ওসমান, চট্টগ্রাম মেট্রো চেম্বারের সভাপতি খলিলুর রহমান, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক মনোয়ারা হাকিম আলী প্রমুখ। বিভিন্ন চেম্বার ও সমিতির নেতারা এতে বক্তব্য দেন।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-08-07/news/176104
Comments
Post a Comment