২০০৬ সাল থেকে বছরে দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে পরবর্তী ছয় মাসে দেশে সামষ্টিক অর্থনীতির গতিধারা কেমন থাকবে_তার একটা আভাস দেওয়া থাকে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা সরবরাহ, ব্যক্তি ও সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কৃষি-শিল্প খাতসহ সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির নানা প্রাক্কলন থাকে। শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না বেশির ভাগ প্রাক্কলনেরই। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই মুদ্রানীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সহায়ক উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকনির্দেশনা মুদ্রানীতিতে থাকা উচিত। মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বিনিয়োগের পথ সংকুচিত করা হচ্ছে_এমন সমালোচনাও রয়েছে। কিছুটা রক্ষণশীলতার কথা প্রকারান্তরে স্বীকার করলেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান নিজেও। তিনি বললেন, কোনো কর্মসূচি কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন হয় কিংবা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আমাদের বাজেটও শতভাগ বাস্তবায়িত হয় না। সুতরাং আমরা বাস্তবায়নকে যদি কর্মসূচির কাছাকাছিও নিয়ে আসতে পারি, আমার মনে হয় সেটিই একটা বিরাট সাফল্য। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে আমরা চেয়েছি যাতে স্বাভাবিক মাত্রার ওপরে থাকা সামষ্টিক সূচকগুলোকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় নেমে আসে। অর্থনীতি যাতে ঝাঁকুনি না খায়, সে বিষয়ে আমরা সচেতন।
জুলাইয়ের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করল অর্ধবার্ষিক মুদ্রানীতি। বরাবরের মতো এবারও বলা হলো, এটি সংকুলানমূলক মুদ্রানীতি। সর্বশেষ ঘোষিত মুদ্রানীতির উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে গভর্নর বললেন, এ কথা ঠিক যে ওইসব দেশই ভালো করেছে, যারা বিচক্ষণতার সঙ্গে তাদের মুদ্রানীতিটাকে সংযত রাখতে পেরেছে। এর বড় উদাহরণ হলো কানাডা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থেকেও কানাডা আজকের অর্থনীতিতে সফল ও গ্রহণযোগ্য একটি দেশ। যথেষ্ট রক্ষণশীল একটা মুদ্রানীতি প্রণয়নের কারণেই অস্ট্রেলিয়া তাদের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে। মন্দা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মুদ্রা শক্তিশালী অবস্থানে আছে। স্থিতিশীলতার স্বার্থে ধীরে ধীরে আমাদের মুদ্রানীতিকে ওই দিকে নিয়ে যেতে হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আর কে রেড্ডি বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনক্লুসিভ মনিটারি পলিসির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্যান্য দেশের জন্যও বাংলাদেশের মুদ্রানীতি অনুসরণীয় হতে পারে।
শুধু মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে আনাটাই এবারের মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য নয় বলে জানালেন গভর্নর। তাঁর ভাষায়, অন্যান্য বারের মতো এবারও প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল_আমরা স্থিতিশীল একটা আর্থিক খাত চাই। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতাই যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে মুদ্রানীতির বাকি লক্ষ্যগুলো পূরণ করা বেশ কঠিন হবে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর আমরা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি প্রাধান্য দেব। আমরা উৎপাদনশীল খাতে ঋণ অনুৎপাদনশীল খাতের তুলনায় বেশি দিতে চাচ্ছি। এর দুটো উদ্দেশ্য; প্রথমত, মুদ্রার সরবরাহ কমবে; দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আমরা নিচের দিক থেকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাচ্ছি। এ কারণেই সংকোচনশীল মনোভাব থাকা সত্ত্বেও কৃষিঋণ কমেনি; বরং বেড়েছে। আমরা চাইব 'অ্যানি পারপাস লোন', বিবাহের জন্য ঋণ ইত্যাদি ব্যাংক যেন না দেয়।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি হচ্ছে বলে জানালেন ড. আতিউর। বললেন, আমার ধারণা, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭-এর চেয়ে বেশি হবে। রপ্তানি খাতে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এতে অনেক কর্মসংস্থান হয়েছে, একে কেন্দ্র করে অনেক উপ-খাত গড়ে উঠেছে। এগুলোর প্রভাব পড়বে প্রবৃদ্ধিতে। আমার ধারণা, সামনের বছর প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একমাত্র উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
গত কয়েকটি মুদ্রানীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের অনেক ফারাক পরিলক্ষিত হয়েছে। অনেকে বলেছেন, প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো বাস্তবমুখী হতে হবে। এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, মুদ্রানীতির শতভাগ পূরণ করতে পারব_এটা আশা করা যায় না। তবে অর্থনীতির ধারা ঠিক করে দেওয়ার চেষ্টা থাকে মুদ্রানীতিতে। 'ইনক্লুসিভ গ্রোথ'-এর জন্য আমরা যে মুদ্রানীতি দিচ্ছি, তা অন্যান্য দেশের তুলনায় আলাদা। অর্থবছরের পরিকল্পনার সঙ্গে এটাকে সমন্বয়ের জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মনিটরি পলিসি কাউন্সিলে বাজেটের আগে আমরা আলাপ করে নিই। গত কয়েকটা মুদ্রানীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের যে ফারাক, সেটা আমরাও উপলব্ধি করছি। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে আমরা ছিলাম মন্দার মধ্যে। তখন ব্যাংকগুলো অর্থনীতিতে টাকা ঢেলেছে, গোটা বিশ্বই তা করেছে। তখন মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে আমরা অনেক নমনীয় থেকেছি। এ কারণে আমাদের ব্যক্তি খাতে ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। আমরাও চেয়েছিলাম মন্দার কারণে ব্যক্তি খাত যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এখন পুনরুদ্ধারের সময়ে আমাদের আস্তে আস্তে লাগাম টেনে ধরতে হবে। এতে সময় লাগবে। এই যে উত্তরণ_নমনীয় থেকে কঠোর মুদ্রানীতির দিকে আমরা যাচ্ছি_এতে একটা ঝাঁকুনি আমাদের সহ্য করতেই হবে। এই ঝাঁকুনিটাকেই অনেকেই মনে করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক বোধ হয় সজোরে ব্রেক চেপেছে। আসলে আমরা ব্রেক কষিনি, আমরা আস্তে করে লেন বদলাচ্ছি। তার মানে এই নয় যে আমরা 'ট্রাক'-এর যাতায়াত কমিয়ে দেব, আমরা বরং চাইব 'লাঙ্ারি বাস' যাতে কম চলাচল করে।
গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ হলো 'কোর ইনফ্ল্যাশন' অর্থাৎ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে খুব একটা নেই। এর মূল কাজটা করে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে আমরা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখার জন্য এ দুটো মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করি। ডলারের বিপরীতে টাকার যে অবচয় ঘটতে দিয়েছি, এটা ছিল যথাযথ পদক্ষেপ। নইলে রিজার্ভ খালি হয়ে যেত। আমাদের এখানে দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন কিছুটা কৃত্রিমভাবে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেটা দীর্ঘদিন ঠেকিয়ে রাখা যৌক্তিক হবে না। তাই এখন আমরা বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করেছি। এ কারণেই ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হঠাৎই বেশি হয়েছে বলে মনে হতে পারে। এটা কিন্তু খুব একটা বেশি হয়নি। যতটা হওয়ার কথা ঠিক ততটাই হয়েছে। হয়তো এতে আমদানিকারকরা কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অপরদিকে রপ্তানিকারক এবং রেমিটাররা উপকৃত হচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই আমাদের এ সমন্বয়টা মেনে নিতে হবে। এ বছর এতটা অবমূল্যায়ন হবে না।
অন্যান্য দেশের মুদ্রানীতির সঙ্গে বাংলাদেশের মুদ্রানীতির পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক বলে জানান ড. আতিউর। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশে মুদ্রানীতিতে 'ইনক্লুসিভ গ্রোথ'-এর চিন্তা করা হয় না। এ চিন্তাটা আমাদের করতে হয়। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে বলা আছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। সে জন্য আমরা ইনক্লুসিভ গ্রোথের চেষ্টা করি। অনেক দেশের প্রবৃদ্ধির তুলনায় আমাদের প্রবৃদ্ধির গুণগত মান ভালো এ অর্থে যে আমাদের প্রবৃদ্ধি আসছে নিচের দিক থেকে। কৃষি, তৈরি পোশাক কিংবা এসএমই_প্রতিটি খাতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গেই সাধারণ মানুষ জড়িত। প্রবৃদ্ধির কারণে তারা লাভবান হচ্ছে। এ গ্রোথ প্রসেসকে সাপোর্টের কারণে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি হচ্ছে। মন্দার মধ্যেও আমাদের ভেতরের চাহিদা ঠিকই আছে। এর ফলে আমাদের দারিদ্র্যও কমছে। কয়েক বছর ধরে আমাদের প্রতিবছর ২ শতাংশের মতো দারিদ্র্য কমছে, যা একটা সময়ে আটকে গিয়েছিল। অন্য দেশের মুদ্রানীতি এতটা 'গ্রোথ সাপোর্টিং' হয় না।
গভর্নর বলেন, এই প্রবৃদ্ধিকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তার মূল কাজ থেকে সরে আসেনি। পৃথিবীর অনেক দেশেই মুদ্রানীতি ছাপানো হয় না, অথচ আমরা লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে মুদ্রানীতি ছাপছি। হয়তো আমরা লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণ করতে পারি না। তবু লক্ষ্যমাত্রা দেওয়ার অনেক সুবিধা রয়েছে। আমরা বুঝতে পারি, আমাদের উদ্দেশ্য কী, কোন দিকে আমরা যাব। যেসব কারণে আগের মুদ্রানীতি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারিনি, ঘোষিত মুদ্রানীতিতে সেটা কাটানোর চেষ্টা করব।
ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কমানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, মুদ্রানীতিতে সরকারের ঋণ ১০ শতাংশ কমানোর কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীও একই ধারণা পোষণ করছেন বলেই আমি জানি। সব কিছুর পরও আমি বলব, বাংলাদেশের মুদ্রানীতি সঠিক পথে এগোচ্ছে এবং এটা বাস্তবায়নযোগ্য, যদি সরকার সহায়তা করে।' এ ক্ষেত্রে দুভাবে সরকার সহায়তা করতে পারে বলে গভর্নর মনে করেন। প্রথমত, সরকার জরুরি ভিত্তিতে অনুৎপাদনশীল প্রকল্পে টাকা দেওয়া বন্ধ করতে পারে। গভর্নর বলেন, অনেকের ধারণা, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়বে; কিন্তু আমাদের বিবেচনা করা উচিত জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি_এসব ভর্তুকি খাতের জন্যই সরকার সাধারণত ঋণ নিয়ে থাকে। যদি ওইসব খাতে ভর্তুকি না দেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কত হবে, সেটাও বিবেচনা করা উচিত। তেলে ভর্তুকি দিয়ে সরকার একদিক থেকে ঠিকই করছে। তবে এটাকে এক জায়গায় না রেখে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে সমন্বয় করতে হবে, বাজেটের সংগতির সঙ্গে মিল রেখে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসতে হবে। এর বাইরে ভর্তুকি যদি দিতে চাই, তাহলে আশপাশের দেশের দামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে না। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বিনষ্ট হবে, তেমনি তেলের 'আউটফ্লো' ঠেকানো যাবে না। নিয়মিতভাবেই সমন্বয় করতে হবে সরকারকে, একবারে বাড়াতে গেলে মানুষের কষ্ট হয় বেশি।
নতুন ব্যাংকের বিষয়ে ড. আতিউর বলেন, 'ব্যাংক আর দেওয়া হবে কি হবে না, সে সিদ্ধান্ত দেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। আইন অনুযায়ী, এ এখতিয়ার একমাত্র পর্ষদেরই। পর্ষদ নিশ্চয়ই বাংলাদেশের অর্থনীতির গত ১০ বছরের অগ্রগতি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি, ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট ভলিউম, আয় বাড়ার কারণে চাহিদার ধরন, বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর সেবার মান, কোন খাতে নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে_এসব কিছু বিবেচনায় এনে একটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেবে।'
Comments
Post a Comment