তবু হচ্ছে বাই ব্যাক আইন

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাই ব্যাক বা শেয়ার পুনঃক্রয় আইনের কোনো উপযোগিতা বা প্রয়োজন নেই_ এমনটাই মনে করেন দেশের উভয় শেয়ারবাজারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরাও জানান, দেশের সম্প্রসারমান অর্থনীতিতে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড দিন দিন বেড়ে চলায় কোম্পানিগুলো নিয়মিত মূলধন বৃদ্ধি করছে। আগামী ৫০ বছরেও মূলধন কমানোর পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। তারপরও কোম্পানি আইন-১৯৯৪ সংশোধন করে বাই ব্যাক ধারা সংযোজনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে একটি আট সদস্যবিশিষ্ট কমিটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত এ কমিটি আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত খসড়া প্রদান করবে বলে জানা গেছে।
গত ডিসেম্বরে অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর কমার প্রেক্ষাপটে ২৩ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে শেয়ারবাজার স্টেকহোল্ডারদের বৈঠকে শেয়ারের দরপতন ঠেকাতে কোম্পানি কর্তৃক শেয়ার বাই ব্যাক করার বিধান চালুর দাবি প্রথম ওঠে।
কিন্তু শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের মতো দেশে, যেখানে সুশাসন ও জবাবদিহির অভাব বেশ প্রকট, সেখানে কেবল শেয়ারদর ধরে রাখার জন্য বাই ব্যাক আইন করা হলে তা বাজার খেলোয়াড়দের জন্য নতুন এক জুয়ার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরই ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়বে। শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, যখন কোনো কোম্পানির অবণ্টিত মুনাফা বা মূলধনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায় এবং নিকট ভবিষ্যতে ওই অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ থাকে না, তখন বাই ব্যাক করার প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু আমাদের দেশে এখনও এ অবস্থা সৃষ্টি হয়নি, আগামী ৫০ বছরেও তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
একই ধরনের মত দিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি শাকিল রিজভী। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অধিকাংশ প্রতি বছর রাইট বা বোনাস শেয়ার ইস্যু করার মধ্য দিয়ে মূলধন বৃদ্ধি করে চলেছে। এখন এ আইন ব্যবহার করার সুযোগ নেই। গত ২৮ জুন বাই ব্যাক আইনের খসড়া প্রণয়ন কমিটির সভায় এফবিসিসিআইয়ের উপদেষ্টা মঞ্জুর আহমেদ আলোচনার এক পর্যায়ে মন্তব্য করেন, ৫০০ বছরেও এ আইনের প্রয়োজন হবে না। শেয়ার বাই ব্যাক আইনের প্রাথমিক খসড়ায় বলা হয়েছিল, বাই ব্যাকের পর এক বছরের মধ্যে কোম্পানি মূলধন বাড়াতে পারবে না; কিন্তু বোনাস লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে। বাজার বিশ্লেষকরা জানান, এ ধারাটি পরস্পরবিরোধী।
কারণ বোনাস লভ্যাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধি পায়। ফলে কোনো কোম্পানি বাই ব্যাক করার মধ্য দিয়ে স্বল্প সময়ের জন্য মূলধন কমালেও বোনাস লভ্যাংশ প্রদানের মাধ্যমে আবারও সে মূলধন ফিরিয়ে নিতে পারবে। মাঝে শেয়ারদর বৃদ্ধির দ্বৈত সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। বিশ্লেষকরা জানান, বোনাস লভ্যাংশ এবং বাই ব্যাক উভয় কারণেই শেয়ারের বাজারদর বৃদ্ধি পায়। তারা আরও সন্দেহ করছেন, আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করতেই এ ধরনের ধারা সংযুক্তির কথা বলা হচ্ছে। ডিএসই ও সিএসইর সভাপতিরাও বলেন, এ ধারাটি পরস্পরবিরোধী।
ডিএসইর সভাপতি শাকিল রিজভী অবশ্য জানান, বাই ব্যাক আইন হলেও তা অপব্যবহার যাতে না হয় সে লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা। তিনি বলেন, বাই ব্যাকের পর অন্তত দু'বছর কোনোভাবেই কোম্পানি যেন মূলধন বৃদ্ধি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রস্তাব রাখা হবে। এছাড়া বাই ব্যাকের জন্য কোম্পানির কোন তহবিল কী পরিমাণ ব্যবহার করা যাবে, কোন দরে শেয়ার কেনা যাবে, সেসব বিষয়ে কমিটি আলোচনা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদও মনে করেন, আইন হতে বাধা নেই। তবে আইনের সুযোগ নিয়ে কোনো গোষ্ঠী যাতে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
প্রসঙ্গত, ১৪ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে কোম্পানি আইনে বাই ব্যাক ধারা সংযুক্ত করার জন্য ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিকে প্রধান করে এসইসি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইসিএমএবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে মোট পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটি উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের দুই প্রতিনিধিকে এ কমিটির সদস্য করে। কমিটিকে ৫ জুলাইয়ের মধ্যে সংশোধনী প্রস্তাবনা জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কমিটি ২৮ জুনের সভায় এ সময়সীমা ৩০ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধির অনুরোধ জানায়।


http://www.samakal.com.bd/details.php?news=48&action=main&menu_type&option=single&news_id=174444&pub_no=756&type

Comments