বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুনাফার অসুস্থ প্রতিযোগিতা

দেশে বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুনাফার অসুস্থ প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে। এক ব্যাংক আরেক ব্যাংকের চেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করতে জড়িয়ে পড়ছে অনৈতিক ব্যাংকিংয়ে। প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির ফলে গ্রাহকদের সুবিধা বৃদ্ধির কথা থাকলেও এ ৰেত্রে ঘটছে উল্টো ঘটনা। আমানতকারীদের নানা ধরনের চার্জ আদায়ের বিপরীতে ঋণ গ্রহীতাদের ওপর চাপানো হচ্ছে বাড়তি সুদের বোঝা। গত এক দেড় মাসে অধিকাংশ ব্যাংকই পুরনো ঋণগ্রহীতাদের ঋণের সুদ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাড়ছে ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের সুদের হারের পার্থক্য। বাংলাদেশ ব্যাংক এ দু' ক্ষেত্রে সুদের হারের মধ্যে পার্থক্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে সীমিত রাখার নির্দেশ দিলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তা মানছে না বলে সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, আগাম কোন ঘোষণা ছাড়াই বেসরকারী খাতের অধিকাংশ ব্যাংক ভোক্তা পর্যায়ে ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা ব্যাংক ১ থেকে দেড় শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংক ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, ব্র্যাক ব্যাংক ২ দশমিক ৫০ শতাংশ সুদ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি অধিকাংশ ব্যাংকের সব ধরনের ক্রেডিট কার্ডের সুদ ও ফির হার বেড়ে গেছে। সিটি ব্যাংকের আমেরিকান এঙ্প্রেসের নগদ টাকা উত্তোলনে এখন থেকে গ্রাহকদের অতিরিক্ত ৩ শতাংশ হারে ফি গুনতে হবে। আগে এই হার ছিল শূন্য। পাশাপাশি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের নগদ টাকা উত্তোলনের সুবিধাও ২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে।
ব্যাংকগুলো এক বছর আগের ধার্য করা ঋণের সুদের হার বাড়ালেও আমানতের সুদের হার বাড়ায়নি। তখন আমানতের সুদের হার ছিল সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর চলতি বছরের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৫০ শতাংশ। গত মাসে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি সম্মিলিতভাবে আমানতের সুদ হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু পুরনো আমানতকারীদের আগের হারেই সুদ দেয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের ৬ মাসে বেসরকারী খাতের ব্যাংকগুলোর উচ্চ পরিচালন মুনাফা করেও এভাবে আগাম ঘোষণা ছাড়া ঋণের সুদের হার বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলেছেন সংশিস্নষ্টরা। তাঁদের মতে, দেশে স্বাধীনতার পর এ ধরনের ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটল। এর আগে আশির দশকের শেষের দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ও নব্বই দশকের গোড়ার দিকে বেসরকারী খাতের কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহক ঋণের সুদ হার বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সংশিস্নষ্টদের মতে, পরিচালন মুনাফা নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। এরপরও তারল্য সঙ্কটের মাঝে ব্যাংকগুলোর উচ্চ মুনাফা ঋণের সুদের হার কমাতে হয়ত সহযোগিতা করবে। তা না করে উল্টো ঋণের সুদের হার বেড়ে গেল। জানা গেছে, পরিচালন মুনাফা নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অধিকাংশ সময়ই তারল্য সঙ্কট বিরাজ করলে ব্যাংকগুলো উচ্চ মুনাফা অর্জন করে। অতিরিক্ত এই মুনাফা ঋণের সুদের হার কমাতে সহায়ক হওয়ার কথা থাকলেও উল্টো তা বাড়িয়ে দিয়েছে অধিকাংশ ব্যাংক।
জানা গেছে, বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে প্রতিবছরই মুনাফার লৰ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয়। ওই লৰ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ উর্ধতন কর্মকর্তাদের তোপের মুখে পড়তে হয়। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মুনাফা অর্জনের অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে আসছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে বড় ধরনের মুনাফা অর্জন করায় গত দু' বছর ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মুনাফার পরিমাণ ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। এ কারণে অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই এ বছর মুনাফার লৰ্যমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু শেয়ারবাজারে বড় ধরনের মন্দার কারণে ব্যাংকগুলোর পৰে পরিচালনা পর্ষদের বেঁধে দেয়া লৰ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি তারল্য সঙ্কটের কারণেও কিছু কিছু ব্যাংক বিপাকে পড়ে। এ অবস্থায় মুনাফার লৰ্যমাত্রা ঠিক রাখতেই পুরনো ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতিরিক্ত সুদ আরোপ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ঋণের সুদ হার বৃদ্ধির কারণে আমানতের সুদের সঙ্গে ব্যবধান (সপ্রেড) বেড়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের সপ্রেড বেড়ে গেছে। অথচ কয়েক মাস আগে এসব ব্যাংকের সপ্রেড সহনীয় ছিল। তারল্য সঙ্কটের মধ্যেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলো উচ্চ পরিচালন মুনাফা করেছে। মূলত সুদের হার বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংকগুলো বেশি মুনাফা করেছে বলে মনে করছেন সংশিস্নষ্টরা।
এদিকে অতিরিক্ত সুদ আরোপের ৰেত্রে বিদেশী ব্যাংকগুলো সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নামলেও কয়েকটি ব্যাংক চলতি মূলধন ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সপ্রেড রয়েছে উরি ব্যাংক (১১.৫১%) ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (১০.৭৪%)।
আমানত ও ঋণের সুদের হারের পার্থক্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে সীমিত রাখার নির্দেশনা দিলেও অধিকাংশ ব্যাংক তা কার্যকর করছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলোর সপ্রেড ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও বেসরকারী খাতের ব্যাংকগুলোর সপ্রেড ১০ শতাংশ পর্যনত্ম দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক (জুন ২০১১) হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মে মাসে বেসরকারী খাতের মিউচু্যয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সপ্রেড সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ ছিল। এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি সপ্রেড ছিল সিটি ব্যাংকের ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপরই রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের ৭ দশমিক ২১ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংকের ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর মে মাসেও একই ধারা অব্যাহত ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে ১২ শতাংশের বেশি হারে কোন ব্যাংকই মেয়াদী আমানত সংগ্রহ না করলেও এপ্রিল মাসে বেশ কয়েকটি ব্যাংকই ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মেয়াদী আমানত সংগ্রহ করেছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি, আইএফআইসি, আল-আরাফা, দি সিটি, প্রাইম, ঢাকা, ব্যাংক এশিয়া, এমটিবিএল, প্রিমিয়ার ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংক চলতি মূলধন ঋণে উচ্চ সুদহার আরোপ করেছে। এরমধ্যে রয়েছে_ বেসিক, এবি, আইএফআইসি, সিটি, স্ট্যান্ডার্ড, এমটিবিএল, ব্যাংক এশিয়া, যমুনা, ইউবিসিবিএল। ব্যাংকগুলো চলতি মূলধনের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদ হার কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে।
এ বিষয়ে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান নজরম্নল ইসলাম মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে জানান, সপ্রেড কম-বেশি যে কোন ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। বিএবি'র পক্ষ থেকে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হবে না।
আমানতের সুদ হার ১২ শতাংশ বেঁধে দিলেও ঋণের সুদ উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকই এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2011-07-27&ni=66123

Comments