পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া পুরোনো (স্ক্র্যাপ) জাহাজ আমদানির অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেওয়া যাবে না। এটি হাইকোর্টের নির্দেশনা। কিন্তু এই নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে দুই মাসে ৭১টি এনওসি দিয়েছে সরকারি সংস্থা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। দুই মাসে এত বেশি পুরোনো জাহাজ আনার ঘটনা এটাই প্রথম বলে জানা গেছে।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল এক দিনেই ২৩টি জাহাজের এনওসি দেওয়া হয়। অতীতে কখনো এক দিনে এত বেশি এনওসি দেওয়া হয়নি। দুই মাসে ৭১টি এনওসি দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সাপ্তাহিক দুই দিন ছুটি এবং অন্যান্য সরকারি ছুটি বাদ দিয়ে ৭ এপ্রিল থেকে ৭ জুন পর্যন্ত দুই মাসে মোট কার্যদিবস ছিল ৪১ দিন। ৪১ দিনে ৭১টি এনওসি দেওয়া কীভাবে সম্ভব? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই এ প্রশ্ন তুলেছেন।
এক দিনে ২৩টি জাহাজের এনওসি দেওয়া কীভাবে সম্ভব, জানতে চাইলে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর জোবায়ের আহমদ বলেন, এসব জাহাজের ব্যাপারে যাচাই-বাছাই আগেই করে রাখা হয়েছিল। আদালত জাহাজ আমদানির অনুমোদন দেওয়ার পরই সব জাহাজের এনওসি একসঙ্গে দেওয়া হয়।
বর্জ্যমুক্ত সনদ ছাড়া জাহাজ আমদানির ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কীভাবে এনওসি দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে জোবায়ের পাল্টা প্রশ্ন করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি জাহাজকে সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া আমরা কীভাবে পরিবেশ ছাড়পত্র দেব? এ জন্য প্রথমে আমরা জাহাজ রপ্তানিকারকের ঘোষণা এবং ইন্টারনেটে যাচাই-বাছাই করে আমদানির ঋণপত্র খোলার জন্য জাহাজ আমদানিকারককে শর্ত সাপেক্ষে এনওসি দিই। পরে দেশীয় জলসীমায় জাহাজটি আসার পর একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সেটিতে পরিবেশ দূষণকারী কোনো দ্রব্য আছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্রের শর্তপূরণ সাপেক্ষে জাহাজকে ইয়ার্ডে ভেড়ানো এবং ভাঙার অনুমোদন দেওয়া হয়।’
আদালত সূত্র জানায়, গত বছরের ১১ মে এবং ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ হাইকোর্ট পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া এনওসি না দেওয়ার নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া গত ৭ মার্চ জাহাজ আমদানির পূর্বশর্ত হিসেবে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের পরিবেশ ছাড়পত্রের সব শর্ত পূরণ ও জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের জন্য ইনস্টিটিউট খোলা, শ্রমিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিসহ ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। আদালতের এসব নির্দেশনা কৌশলে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
এনওসি প্রদানকারী সরকারি সংস্থা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মুখ্য রসায়নবিদ মোশাররফ আশরাফকে গত ২৮ এপ্রিল এ জন্য আদালত অবমাননার নোটিশ দেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
আগে এনওসি দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, ভালোভাবে এসব পরীক্ষা করে দেখতে হলে দিনে বড়জোর একটি জাহাজের এনওসি দেওয়া যায়। তা ছাড়া এনওসি দেওয়া ছাড়া কর্মকর্তাদের প্রতিদিনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে।
জানা যায়, আগে অধিদপ্তরের কনিষ্ঠ রসায়নবিদ ফৌজিয়া রহমানের সহায়তা নিয়ে প্রধান রসায়নবিদ মোশাররফ আশরাফের সই নিয়ে এনওসি দেওয়া হতো। সম্প্রতি মোশাররফ নারায়ণগঞ্জে বদলি হওয়ায় এখন এনওসি দেওয়া হয় একজন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে।
সব জাহাজের একই পরিদর্শন প্রতিবেদন: এনওসির ভিত্তিতে আমদানি করা স্ক্র্যাপ জাহাজে পরিবেশ দূষণকারী কোনো বর্জ্য আছে কি না, তা সরেজমিনে পরীক্ষা করে দেখার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের পরিচালক জাফর আলম ছাড়াও মেরিন একাডেমির দুজন প্রশিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক দেবাশীষ পালিত ও নাবিক কল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক নজরুল ইসলাম। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাহাজ বিচিং করার অনুমোদন দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। আদালত বললেও এ কমিটিতে সুশীল সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি।
কমিটি সূত্রে জানা গেছে, দুই মাসে তারা ৬৯টি স্ক্র্যাপ জাহাজ পরিদর্শন করে। কিন্তু বিচিংয়ের যোগ্য নয় কিংবা পরিবেশ দূষণকারী পদার্থ আছে এমন একটি জাহাজও শনাক্ত করতে পারেনি এ কমিটি। বরং শতভাগ জাহাজকে বিচিংয়ের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কমিটির কম্পিউটার কম্পোজ করা ৬৯টি প্রতিবেদনের প্রতিটির বক্তব্য একই ধরনের। শুধু জাহাজের নাম, পরিচয় এবং আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা আলাদা।
৩ নম্বর সতর্কসংকেতেও পরিদর্শন: চলতি বর্ষা মৌসুমে এমনিতেই সাগর থাকে উত্তাল। এ ক্ষেত্রে আবহাওয়ার সতর্কসংকেত থাকলে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু কয়েকটি পরিদর্শন প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, আবহাওয়ার ৩ নম্বর সতর্কসংকেত ছিল এমন অবস্থার মধ্যেও বিশেষজ্ঞ কমিটি সাগরে গিয়ে জাহাজে চড়েছে এবং ওই জাহাজ বিচিংয়ে উপযোগী বলে প্রতিবেদন দিয়েছে।
২৭ এপ্রিল সতর্কসংকেত বহাল ছিল। এদিন বিশেষজ্ঞ কমিটির তিন সদস্য এমভি মাইকোনোস নামের একটি জাহাজ পরিদর্শন করে জাহাজটি বিচিং করার উপযোগী বলে প্রতিবেদন দেন। এ কমিটিতে ছিলেন মেরিন একাডেমির ঊর্ধ্বতন প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম, শিক্ষক দেবাশীষ পালিত ও জাফর আলম। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁরা তিনজন কর্ণফুলী নদীর কয়লার ডিপো থেকে টাগবোটে করে বহির্নোঙরে যান এবং সাগরে নোঙর করা জাহাজে রশির সিঁড়ি (রোপ লেডার) ও গ্যাংওয়ে ধরে জাহাজটিতে আরোহণ করেন। ৩ নম্বর সতর্কসংকেতের সময় উত্তাল সমুদ্রে রশির সিঁড়ি বেয়ে সাগরের কোনো জাহাজে আরোহণ আদৌ সম্ভব নয় বলে একাধিক মাস্টার মেরিনার জানিয়েছেন।
একইভাবে গত ১২ মে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য আবহাওয়ার ৩ নম্বর সতর্কসংকেত ছিল। ওই সময় উত্তাল সমুদ্রে গিয়ে ওই তিন বিশেষজ্ঞ রশির সিঁড়ি বেয়ে এবং জাহাজের সিঁড়ি বেয়ে এমভি ফ্রেন্ডস এস নামের জাহাজে ওঠেন বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ দলে জাফর আলমের পরিবর্তে ছিলেন মেরিন একাডেমির ঊর্ধ্বতন নৌ প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন সাব্বীর মাহমুদ। পরিদর্শন প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, দুটি দলেই উপস্থিত ছিলেন দেবাশীষ পালিত।
গত সোমবার রাতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে দেবাশীষ পালিত জাহাজ দুটিতে না উঠেই পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিলের কথা স্বীকার করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়ার ৩ নম্বর সতর্কসংকেত থাকায় ওই জাহাজ দুটিতে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় আমরা একটি গাইডলাইনের ভিত্তিতে জাহাজে কোন ধরনের বর্জ্য থাকতে পারে, তার একটা হিসাব করি।’
ইয়ার্ডে ৬৭টি জাহাজ: চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত দুই মাসে অনাপত্তিপত্র পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দ্রুত জাহাজ আমদানি করে সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় ইয়ার্ডে ৬৭টি জাহাজ ভিড়িয়েছেন (বিচিং)। বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের বিগত ৩০ বছরের ইতিহাসে মাত্র তিন মাসে এত বেশি পুরোনো জাহাজ আমদানির নজির নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে ১৭টি, মে মাসে ২৪টি এবং জুনে ১০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়। পরের বছরের (২০০৯ সালে) তিন মাসে ভাঙার জন্য জাহাজ আনা হয় যথাক্রমে ১৫, ১৩ ও ছয়টি। গত বছরের জুনে কোনো জাহাজ আমদানি হয়নি। এপ্রিল ও মে মাসে আমদানি হয় যথাক্রমে ২১ ও ১০টি। চলতি বছরের এপ্রিলে ২৫টি, মে মাসে ২৪টি এবং গত সোমবার পর্যন্ত ১৮টি জাহাজ বিচিং হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে আছে আরও ১০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ। এ মাসের মধ্যে সবগুলো বিচিং হলে চলতি মাসে স্ক্র্যাপ জাহাজের আমদানির সংখ্যা দাঁড়াবে ২৮।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ৭ এপ্রিলের পর ৩ মে এক দিনে আটটি, ৫ মে চারটি, ২৪ মে চারটি, ২৫ মে পাঁচটি এবং ২৬ মে ছয়টি স্ক্র্যাপ জাহাজের এনওসি দেওয়া হয়। এর আগে বিভিন্ন তারিখে প্রতি দু-তিন দিন অন্তর দু-তিনটি করে এনওসি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো জাহাজের জন্য একাধিকবার এনওসি দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর জোবায়ের আহমদ বলেন, আমদানিকারক একবার এনওসি নিয়ে ব্যাংকিং জটিলতা কিংবা অন্য কারণে জাহাজ আমদানি না-ও করতে পারে। সে জন্য হয়তো কোনো জাহাজের ক্ষেত্রে দুবার অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-06-22/news/164408
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল এক দিনেই ২৩টি জাহাজের এনওসি দেওয়া হয়। অতীতে কখনো এক দিনে এত বেশি এনওসি দেওয়া হয়নি। দুই মাসে ৭১টি এনওসি দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সাপ্তাহিক দুই দিন ছুটি এবং অন্যান্য সরকারি ছুটি বাদ দিয়ে ৭ এপ্রিল থেকে ৭ জুন পর্যন্ত দুই মাসে মোট কার্যদিবস ছিল ৪১ দিন। ৪১ দিনে ৭১টি এনওসি দেওয়া কীভাবে সম্ভব? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই এ প্রশ্ন তুলেছেন।
এক দিনে ২৩টি জাহাজের এনওসি দেওয়া কীভাবে সম্ভব, জানতে চাইলে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর জোবায়ের আহমদ বলেন, এসব জাহাজের ব্যাপারে যাচাই-বাছাই আগেই করে রাখা হয়েছিল। আদালত জাহাজ আমদানির অনুমোদন দেওয়ার পরই সব জাহাজের এনওসি একসঙ্গে দেওয়া হয়।
বর্জ্যমুক্ত সনদ ছাড়া জাহাজ আমদানির ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কীভাবে এনওসি দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে জোবায়ের পাল্টা প্রশ্ন করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি জাহাজকে সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া আমরা কীভাবে পরিবেশ ছাড়পত্র দেব? এ জন্য প্রথমে আমরা জাহাজ রপ্তানিকারকের ঘোষণা এবং ইন্টারনেটে যাচাই-বাছাই করে আমদানির ঋণপত্র খোলার জন্য জাহাজ আমদানিকারককে শর্ত সাপেক্ষে এনওসি দিই। পরে দেশীয় জলসীমায় জাহাজটি আসার পর একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সেটিতে পরিবেশ দূষণকারী কোনো দ্রব্য আছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্রের শর্তপূরণ সাপেক্ষে জাহাজকে ইয়ার্ডে ভেড়ানো এবং ভাঙার অনুমোদন দেওয়া হয়।’
আদালত সূত্র জানায়, গত বছরের ১১ মে এবং ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ হাইকোর্ট পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া এনওসি না দেওয়ার নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া গত ৭ মার্চ জাহাজ আমদানির পূর্বশর্ত হিসেবে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের পরিবেশ ছাড়পত্রের সব শর্ত পূরণ ও জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের জন্য ইনস্টিটিউট খোলা, শ্রমিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিসহ ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। আদালতের এসব নির্দেশনা কৌশলে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
এনওসি প্রদানকারী সরকারি সংস্থা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মুখ্য রসায়নবিদ মোশাররফ আশরাফকে গত ২৮ এপ্রিল এ জন্য আদালত অবমাননার নোটিশ দেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
আগে এনওসি দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, ভালোভাবে এসব পরীক্ষা করে দেখতে হলে দিনে বড়জোর একটি জাহাজের এনওসি দেওয়া যায়। তা ছাড়া এনওসি দেওয়া ছাড়া কর্মকর্তাদের প্রতিদিনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে।
জানা যায়, আগে অধিদপ্তরের কনিষ্ঠ রসায়নবিদ ফৌজিয়া রহমানের সহায়তা নিয়ে প্রধান রসায়নবিদ মোশাররফ আশরাফের সই নিয়ে এনওসি দেওয়া হতো। সম্প্রতি মোশাররফ নারায়ণগঞ্জে বদলি হওয়ায় এখন এনওসি দেওয়া হয় একজন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে।
সব জাহাজের একই পরিদর্শন প্রতিবেদন: এনওসির ভিত্তিতে আমদানি করা স্ক্র্যাপ জাহাজে পরিবেশ দূষণকারী কোনো বর্জ্য আছে কি না, তা সরেজমিনে পরীক্ষা করে দেখার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের পরিচালক জাফর আলম ছাড়াও মেরিন একাডেমির দুজন প্রশিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক দেবাশীষ পালিত ও নাবিক কল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক নজরুল ইসলাম। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাহাজ বিচিং করার অনুমোদন দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। আদালত বললেও এ কমিটিতে সুশীল সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি।
কমিটি সূত্রে জানা গেছে, দুই মাসে তারা ৬৯টি স্ক্র্যাপ জাহাজ পরিদর্শন করে। কিন্তু বিচিংয়ের যোগ্য নয় কিংবা পরিবেশ দূষণকারী পদার্থ আছে এমন একটি জাহাজও শনাক্ত করতে পারেনি এ কমিটি। বরং শতভাগ জাহাজকে বিচিংয়ের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কমিটির কম্পিউটার কম্পোজ করা ৬৯টি প্রতিবেদনের প্রতিটির বক্তব্য একই ধরনের। শুধু জাহাজের নাম, পরিচয় এবং আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা আলাদা।
৩ নম্বর সতর্কসংকেতেও পরিদর্শন: চলতি বর্ষা মৌসুমে এমনিতেই সাগর থাকে উত্তাল। এ ক্ষেত্রে আবহাওয়ার সতর্কসংকেত থাকলে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু কয়েকটি পরিদর্শন প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, আবহাওয়ার ৩ নম্বর সতর্কসংকেত ছিল এমন অবস্থার মধ্যেও বিশেষজ্ঞ কমিটি সাগরে গিয়ে জাহাজে চড়েছে এবং ওই জাহাজ বিচিংয়ে উপযোগী বলে প্রতিবেদন দিয়েছে।
২৭ এপ্রিল সতর্কসংকেত বহাল ছিল। এদিন বিশেষজ্ঞ কমিটির তিন সদস্য এমভি মাইকোনোস নামের একটি জাহাজ পরিদর্শন করে জাহাজটি বিচিং করার উপযোগী বলে প্রতিবেদন দেন। এ কমিটিতে ছিলেন মেরিন একাডেমির ঊর্ধ্বতন প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম, শিক্ষক দেবাশীষ পালিত ও জাফর আলম। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁরা তিনজন কর্ণফুলী নদীর কয়লার ডিপো থেকে টাগবোটে করে বহির্নোঙরে যান এবং সাগরে নোঙর করা জাহাজে রশির সিঁড়ি (রোপ লেডার) ও গ্যাংওয়ে ধরে জাহাজটিতে আরোহণ করেন। ৩ নম্বর সতর্কসংকেতের সময় উত্তাল সমুদ্রে রশির সিঁড়ি বেয়ে সাগরের কোনো জাহাজে আরোহণ আদৌ সম্ভব নয় বলে একাধিক মাস্টার মেরিনার জানিয়েছেন।
একইভাবে গত ১২ মে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য আবহাওয়ার ৩ নম্বর সতর্কসংকেত ছিল। ওই সময় উত্তাল সমুদ্রে গিয়ে ওই তিন বিশেষজ্ঞ রশির সিঁড়ি বেয়ে এবং জাহাজের সিঁড়ি বেয়ে এমভি ফ্রেন্ডস এস নামের জাহাজে ওঠেন বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ দলে জাফর আলমের পরিবর্তে ছিলেন মেরিন একাডেমির ঊর্ধ্বতন নৌ প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন সাব্বীর মাহমুদ। পরিদর্শন প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, দুটি দলেই উপস্থিত ছিলেন দেবাশীষ পালিত।
গত সোমবার রাতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে দেবাশীষ পালিত জাহাজ দুটিতে না উঠেই পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিলের কথা স্বীকার করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়ার ৩ নম্বর সতর্কসংকেত থাকায় ওই জাহাজ দুটিতে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় আমরা একটি গাইডলাইনের ভিত্তিতে জাহাজে কোন ধরনের বর্জ্য থাকতে পারে, তার একটা হিসাব করি।’
ইয়ার্ডে ৬৭টি জাহাজ: চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত দুই মাসে অনাপত্তিপত্র পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দ্রুত জাহাজ আমদানি করে সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় ইয়ার্ডে ৬৭টি জাহাজ ভিড়িয়েছেন (বিচিং)। বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের বিগত ৩০ বছরের ইতিহাসে মাত্র তিন মাসে এত বেশি পুরোনো জাহাজ আমদানির নজির নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে ১৭টি, মে মাসে ২৪টি এবং জুনে ১০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়। পরের বছরের (২০০৯ সালে) তিন মাসে ভাঙার জন্য জাহাজ আনা হয় যথাক্রমে ১৫, ১৩ ও ছয়টি। গত বছরের জুনে কোনো জাহাজ আমদানি হয়নি। এপ্রিল ও মে মাসে আমদানি হয় যথাক্রমে ২১ ও ১০টি। চলতি বছরের এপ্রিলে ২৫টি, মে মাসে ২৪টি এবং গত সোমবার পর্যন্ত ১৮টি জাহাজ বিচিং হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে আছে আরও ১০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ। এ মাসের মধ্যে সবগুলো বিচিং হলে চলতি মাসে স্ক্র্যাপ জাহাজের আমদানির সংখ্যা দাঁড়াবে ২৮।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ৭ এপ্রিলের পর ৩ মে এক দিনে আটটি, ৫ মে চারটি, ২৪ মে চারটি, ২৫ মে পাঁচটি এবং ২৬ মে ছয়টি স্ক্র্যাপ জাহাজের এনওসি দেওয়া হয়। এর আগে বিভিন্ন তারিখে প্রতি দু-তিন দিন অন্তর দু-তিনটি করে এনওসি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো জাহাজের জন্য একাধিকবার এনওসি দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর জোবায়ের আহমদ বলেন, আমদানিকারক একবার এনওসি নিয়ে ব্যাংকিং জটিলতা কিংবা অন্য কারণে জাহাজ আমদানি না-ও করতে পারে। সে জন্য হয়তো কোনো জাহাজের ক্ষেত্রে দুবার অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-06-22/news/164408
Comments
Post a Comment