দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তা নানা কারসাজির মাধ্যমে লুটপাট হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব লুটপাট ধরা পড়ে না। সম্প্রতি বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে এমন লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল। তাদের প্রতিবেদনে এ লুটপাটে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর পাশাপাশি কিছু ব্যাংকারের জড়িত থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তিনটি ব্যাংক থেকে লুট হওয়া নগদ সহায়তার প্রায় ২৭ কোটি টাকা আদায়ের জন্য এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ টাওয়েলস, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস ও হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইল লিমিটেড নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের কন্ট্রাক্টের বিপরীতে বে-ইয়ার্নের নামে স্থানীয় ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা হয়। অথচ বে-ইয়ার্ন নামে কোনো স্পিনিং মিলের অস্তিত্ব নেই। ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে মূলত স্থানীয় স্পিনিং মিল থেকে সুতা কিনে তা দিয়ে বস্ত্র বা টাওয়েল প্রস্তুত করে বিদেশে রপ্তানি করা হলে সরকারের ঘোষিত নগদ সহায়তা সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু স্থানীয় স্পিনিং মিলে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার না করে স্থানীয় বাজার থেকে সুতা কিনে তা দিয়ে তৈরি বস্ত্র বা টাওয়েল রপ্তানি করা হলে ওই সহায়তা পাওয়া যায় না। তাই খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারী নিজেই একটি অস্তিত্ববিহীন স্থানীয় স্পিনিং মিলের নামে (বে-ইয়ার্ন) একোমোডেশন বিল তৈরি করে প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
প্রাইম ব্যাংক, মতিঝিল শাখা : এ শাখা পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, "মেসার্স বিসমিল্লাহ টাওয়েলস ও মেসার্স আলফা কম্পোজিট লিমিটেড ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে মেসার্স বে-ইয়ার্ন স্পিনিং মিলসহ অন্যান্য স্পিনিং মিল থেকে সুতা আমদানি করে টাওয়েল রপ্তানি দেখিয়েছে। বে-ইয়ার্ন নামে কোনো স্পিনিং মিল না থাকায় এবং ২০০৩ সালে জারি করা ফরেন এঙ্চেঞ্জ (এফই) ৭ নম্বর সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিটিএমএর 'সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন' দাখিল করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন 'জিএসপি ফ্যাসিলিটি পারপোজ নট ভেলিড আদার পারপোজ'-এর মাধ্যমে প্রদত্ত নগদ সহায়তা বাবদ প্রায় ১৭ কোটি টাকা প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড থেকে আদায়যোগ্য।"
পরিদর্শক দল প্রমাণ পেয়েছে, কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই এ ক্ষেত্রে নগদ সহায়তার অর্থ প্রদান করেছে প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা। এমনকি ব্যাংকের ইন্টারন্যাল ও আউটার অডিট ফার্মও টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী অডিট সম্পাদন করেনি, যা অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
শাখা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'শাখা ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশ ব্যাংকের এফই বিভাগ থেকে সার্কুলারের (২০০১ সালে জারি করা ৩ নম্বর সার্কুলার) নির্দেশনা অনুযায়ী বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতার সাথে রপ্তানির পরিমাণের বিষয়টি যাচাই করেনি। এই সার্কুলারের বর্ণিত নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অনিয়মিতভাবে উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যা শাস্তিযোগ্য।'
অডিট ফার্মের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, '২০০২ সালের ২ জুন ফরেন এঙ্চেঞ্জ বিভাগ থেকে জারি করা সার্কুলারে বর্ণিত টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী অডিটকাজ সম্পাদন না করায় এ অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট অডিট ফার্ম (সাইফুল সামসুল আলম অ্যান্ড কোং) দায়ী।' ইন্টারন্যাল অডিট ফার্মের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'ব্যাংকের ইন্টারন্যাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্সের দুর্বলতার কারণে এ অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের ঘোষিত নগদ সহায়তার অপব্যবহার হচ্ছে।'
জনতা ব্যাংক : খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন অপর একটি প্রতিষ্ঠান হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইলস বে-ইয়ার্নকে ব্যবহার করে জনতা ব্যাংকের মগবাজার শাখা থেকে তিন কোটি ৭৯ লাখ টাকা নগদ সহায়তা হাতিয়ে নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইল মিলস লিমিটেড ফরেন এঙ্চেঞ্জ সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী 'বিটিএমের সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন' দাখিল করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন 'জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ পারপোজ নট ভেলিড আদার পারপোজ'-এর মাধ্যমে নগদ সহায়তা বাবদ তিন কোটি ৭৯ লাখ টাকা গ্রহণ করায় তা ফেরতযোগ্য।"
জনতা ব্যাংকের জনতা ভবনের করপোরেট শাখায়ও পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন অপর প্রতিষ্ঠান আলফা কম্পোজিট টাওয়েলসের একটি নগদ সহায়তা আবেদন জমা রয়েছে। কিন্তু পরিদর্শনকাল পর্যন্ত তা প্রদান করা হয়নি। এ বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'রপ্তানিকারকদের মধ্যে আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেড ২০১০ সালের নভেম্বর থেকে এই শাখার মাধ্যমে ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৪৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার টাওয়েল রপ্তানি করেছে। উল্লেখ্য, ওই প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত এই শাখা থেকে ক্যাশ ইনসেনটিভ সুবিধা গ্রহণ করেনি, তবে এর জন্য আবেদন করেছে। প্রসঙ্গত, এই রপ্তানিকারকের স্থানীয় সুতা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হলো বে-ইয়ার্ন। বে-ইয়ার্নের স্পিনিং মিল না থাকায় রপ্তানিকারক কোনো প্রকার নগদ সুবিধা প্রাপ্য হবেন না।'
সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিন্সিপাল শাখা : প্রায় একই কায়দায় অস্তিত্ববিহীন স্পিনিং মিল বে-ইয়ার্নের নাম ব্যবহার করে সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকেও রপ্তানি করা পণ্যের বিপরীতে প্রায় ছয় কোটি টাকা নগদ সহায়তা হাতিয়ে নিয়েছেন খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারী।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, '২৪টি ব্যাক টু ব্যাক এলসির মধ্যে ২১টির বেনিফিশিয়ারি হলো বে-ইয়ার্ন। বেনিফিশিয়ারি ব্যাংক হলো প্রাইম ব্যাংক, ফরেন এঙ্চেঞ্জ শাখা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের কলাবাগান, নবাবপুর, গুলশান ও রোকেয়া সরণি শাখা। অথচ বে-ইয়ার্ন নামে কোনো স্পিনিং মিল নেই।'
সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখাতেই পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন আলফা কম্পোজিটের একটি নগদ সহায়তার আবেদন জমা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন চলার সময় পর্যন্ত তা পরিশোধ করেনি সাউথইস্ট ব্যাংকের ওই শাখা। এ বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'একটি বিলমূল্য প্রত্যাবাসনের বিপরীতে মেসার্স আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেড ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শুল্ক ও ডিউটি ড্র-ব্যাক-এর পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তা পরিশোধের জন্য আবেদন করে। ওই আবেদন ব্যাংক কর্তৃক ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গ্রহণ করা হলেও পরিদর্শন সময়কালীন পর্যন্ত বহির্নিরীক্ষক কর্তৃক তা নিরীক্ষা করানো বা ওই আবেদনের বিপরীতে কোনো অগ্রিম প্রদান করা হয়নি।'
ছাড় পাচ্ছে না কোনো ব্যাংকই : সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তা যথাযথ দাবির বিপরীতে পরিশোধে ব্যর্থতার দায়ে প্রাইম, সাউথইস্ট ও জনতা ব্যাংক_কোনোটিকেই ছাড় দিচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এ তিনটি ব্যাংকের কাছ থেকে আমরা প্রায় ২৭ কোটি টাকা আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরই মধ্যে এদের অ্যাকাউন্ট থেকে এ টাকা কেন কর্তন করে নেওয়া হবে না_এ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব যথাযথ না হলে তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত অ্যাকাউন্ট থেকে এ টাকা সমন্বয় করা হবে।'
কিন্তু প্রকৃত দোষী বিসমিল্লাহ টাওয়েলস, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস ও হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইল লিমিটেডের কী হবে তা জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, সেহেতু তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তবে ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা আছে এবং তাদের হিসাবও রয়েছে, তাই ব্যাংক তার গ্রাহকের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় করবে। তবে কিভাবে আদায় করবে সেটা তাদের বিষয়।
এদিকে নগদ সহায়তা যাতে যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয় সেজন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আমিনুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্তে যেহেতু আমাদের ব্যাংকের একটি শাখায় এমন একটি ঘটনা পেয়েছে, সেহেতু তারা আমাদের অ্যাকাউন্ট ডেবিট করে সে টাকা নিয়ে নেবে। পরে আমরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এ টাকা আদায় করব।'
আমিনুর রহমান বলেন, "সরকার রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতেই নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে। কেউ যদি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নগদ সহায়তা নিয়ে থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই অপরাধ। কেউ জাল কাগজপত্র দিয়ে নগদ সহায়তা দাবি করলে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তা বোঝার উপায় থাকে না। শাখা ব্যবস্থাপক হয়তো ভালো ক্লায়েন্ট হিসেবে 'অন গুড ফেইথ' তা পরিশোধ করে থাকতে পারে। আর ওই শাখার কেউ যদি এ অপরাধের সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এ ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত কি না তা তদন্তে শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি।"
প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এহসানুল হক বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের তদন্তে ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম পেয়েছে। তবে এটা এখনো আলোচনাসাপেক্ষ। আমরা নিজেরাও তা খুঁজে দেখছি।'
যে প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ববিহীন স্পিনিং মিল দেখিয়ে নগদ সহায়তা নিয়েছে তাদের জালিয়াত বলতে রাজি নন এম এহসানুল হক। তিনি বলেন, 'যে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে এ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে আমরা তাদের সঙ্গেও কথা বলছি। কাজেই যেখানে আলোচনা এখনো চলছে, সেখানে এ নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত কথা বলবেন বলে জানান এম এহসানুল হক।'
এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আলমের মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে আবার ফোন করা হলে সংযোগটি বন্ধ পাওয়া যায়। http://www.dailykalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Tourist&pub_no=555&cat_id=1&menu_id=13&news_type_id=1&index=4
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ টাওয়েলস, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস ও হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইল লিমিটেড নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের কন্ট্রাক্টের বিপরীতে বে-ইয়ার্নের নামে স্থানীয় ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা হয়। অথচ বে-ইয়ার্ন নামে কোনো স্পিনিং মিলের অস্তিত্ব নেই। ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে মূলত স্থানীয় স্পিনিং মিল থেকে সুতা কিনে তা দিয়ে বস্ত্র বা টাওয়েল প্রস্তুত করে বিদেশে রপ্তানি করা হলে সরকারের ঘোষিত নগদ সহায়তা সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু স্থানীয় স্পিনিং মিলে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার না করে স্থানীয় বাজার থেকে সুতা কিনে তা দিয়ে তৈরি বস্ত্র বা টাওয়েল রপ্তানি করা হলে ওই সহায়তা পাওয়া যায় না। তাই খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারী নিজেই একটি অস্তিত্ববিহীন স্থানীয় স্পিনিং মিলের নামে (বে-ইয়ার্ন) একোমোডেশন বিল তৈরি করে প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
প্রাইম ব্যাংক, মতিঝিল শাখা : এ শাখা পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, "মেসার্স বিসমিল্লাহ টাওয়েলস ও মেসার্স আলফা কম্পোজিট লিমিটেড ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে মেসার্স বে-ইয়ার্ন স্পিনিং মিলসহ অন্যান্য স্পিনিং মিল থেকে সুতা আমদানি করে টাওয়েল রপ্তানি দেখিয়েছে। বে-ইয়ার্ন নামে কোনো স্পিনিং মিল না থাকায় এবং ২০০৩ সালে জারি করা ফরেন এঙ্চেঞ্জ (এফই) ৭ নম্বর সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিটিএমএর 'সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন' দাখিল করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন 'জিএসপি ফ্যাসিলিটি পারপোজ নট ভেলিড আদার পারপোজ'-এর মাধ্যমে প্রদত্ত নগদ সহায়তা বাবদ প্রায় ১৭ কোটি টাকা প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড থেকে আদায়যোগ্য।"
পরিদর্শক দল প্রমাণ পেয়েছে, কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই এ ক্ষেত্রে নগদ সহায়তার অর্থ প্রদান করেছে প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা। এমনকি ব্যাংকের ইন্টারন্যাল ও আউটার অডিট ফার্মও টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী অডিট সম্পাদন করেনি, যা অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
শাখা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'শাখা ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশ ব্যাংকের এফই বিভাগ থেকে সার্কুলারের (২০০১ সালে জারি করা ৩ নম্বর সার্কুলার) নির্দেশনা অনুযায়ী বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতার সাথে রপ্তানির পরিমাণের বিষয়টি যাচাই করেনি। এই সার্কুলারের বর্ণিত নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অনিয়মিতভাবে উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যা শাস্তিযোগ্য।'
অডিট ফার্মের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, '২০০২ সালের ২ জুন ফরেন এঙ্চেঞ্জ বিভাগ থেকে জারি করা সার্কুলারে বর্ণিত টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী অডিটকাজ সম্পাদন না করায় এ অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট অডিট ফার্ম (সাইফুল সামসুল আলম অ্যান্ড কোং) দায়ী।' ইন্টারন্যাল অডিট ফার্মের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'ব্যাংকের ইন্টারন্যাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্সের দুর্বলতার কারণে এ অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের ঘোষিত নগদ সহায়তার অপব্যবহার হচ্ছে।'
জনতা ব্যাংক : খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন অপর একটি প্রতিষ্ঠান হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইলস বে-ইয়ার্নকে ব্যবহার করে জনতা ব্যাংকের মগবাজার শাখা থেকে তিন কোটি ৭৯ লাখ টাকা নগদ সহায়তা হাতিয়ে নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইল মিলস লিমিটেড ফরেন এঙ্চেঞ্জ সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী 'বিটিএমের সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন' দাখিল করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং সার্টিফিকেট অব প্রোডাকশন 'জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ পারপোজ নট ভেলিড আদার পারপোজ'-এর মাধ্যমে নগদ সহায়তা বাবদ তিন কোটি ৭৯ লাখ টাকা গ্রহণ করায় তা ফেরতযোগ্য।"
জনতা ব্যাংকের জনতা ভবনের করপোরেট শাখায়ও পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন অপর প্রতিষ্ঠান আলফা কম্পোজিট টাওয়েলসের একটি নগদ সহায়তা আবেদন জমা রয়েছে। কিন্তু পরিদর্শনকাল পর্যন্ত তা প্রদান করা হয়নি। এ বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'রপ্তানিকারকদের মধ্যে আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেড ২০১০ সালের নভেম্বর থেকে এই শাখার মাধ্যমে ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৪৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার টাওয়েল রপ্তানি করেছে। উল্লেখ্য, ওই প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত এই শাখা থেকে ক্যাশ ইনসেনটিভ সুবিধা গ্রহণ করেনি, তবে এর জন্য আবেদন করেছে। প্রসঙ্গত, এই রপ্তানিকারকের স্থানীয় সুতা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হলো বে-ইয়ার্ন। বে-ইয়ার্নের স্পিনিং মিল না থাকায় রপ্তানিকারক কোনো প্রকার নগদ সুবিধা প্রাপ্য হবেন না।'
সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিন্সিপাল শাখা : প্রায় একই কায়দায় অস্তিত্ববিহীন স্পিনিং মিল বে-ইয়ার্নের নাম ব্যবহার করে সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকেও রপ্তানি করা পণ্যের বিপরীতে প্রায় ছয় কোটি টাকা নগদ সহায়তা হাতিয়ে নিয়েছেন খাজা সোলেমান আনোয়ার পাটোয়ারী।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, '২৪টি ব্যাক টু ব্যাক এলসির মধ্যে ২১টির বেনিফিশিয়ারি হলো বে-ইয়ার্ন। বেনিফিশিয়ারি ব্যাংক হলো প্রাইম ব্যাংক, ফরেন এঙ্চেঞ্জ শাখা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের কলাবাগান, নবাবপুর, গুলশান ও রোকেয়া সরণি শাখা। অথচ বে-ইয়ার্ন নামে কোনো স্পিনিং মিল নেই।'
সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখাতেই পাটোয়ারীর পরিচালনাধীন আলফা কম্পোজিটের একটি নগদ সহায়তার আবেদন জমা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন চলার সময় পর্যন্ত তা পরিশোধ করেনি সাউথইস্ট ব্যাংকের ওই শাখা। এ বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'একটি বিলমূল্য প্রত্যাবাসনের বিপরীতে মেসার্স আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেড ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শুল্ক ও ডিউটি ড্র-ব্যাক-এর পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তা পরিশোধের জন্য আবেদন করে। ওই আবেদন ব্যাংক কর্তৃক ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গ্রহণ করা হলেও পরিদর্শন সময়কালীন পর্যন্ত বহির্নিরীক্ষক কর্তৃক তা নিরীক্ষা করানো বা ওই আবেদনের বিপরীতে কোনো অগ্রিম প্রদান করা হয়নি।'
ছাড় পাচ্ছে না কোনো ব্যাংকই : সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তা যথাযথ দাবির বিপরীতে পরিশোধে ব্যর্থতার দায়ে প্রাইম, সাউথইস্ট ও জনতা ব্যাংক_কোনোটিকেই ছাড় দিচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এ তিনটি ব্যাংকের কাছ থেকে আমরা প্রায় ২৭ কোটি টাকা আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরই মধ্যে এদের অ্যাকাউন্ট থেকে এ টাকা কেন কর্তন করে নেওয়া হবে না_এ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব যথাযথ না হলে তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত অ্যাকাউন্ট থেকে এ টাকা সমন্বয় করা হবে।'
কিন্তু প্রকৃত দোষী বিসমিল্লাহ টাওয়েলস, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস ও হিন্দোলওয়ালী টেঙ্টাইল লিমিটেডের কী হবে তা জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, সেহেতু তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তবে ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা আছে এবং তাদের হিসাবও রয়েছে, তাই ব্যাংক তার গ্রাহকের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় করবে। তবে কিভাবে আদায় করবে সেটা তাদের বিষয়।
এদিকে নগদ সহায়তা যাতে যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয় সেজন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আমিনুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্তে যেহেতু আমাদের ব্যাংকের একটি শাখায় এমন একটি ঘটনা পেয়েছে, সেহেতু তারা আমাদের অ্যাকাউন্ট ডেবিট করে সে টাকা নিয়ে নেবে। পরে আমরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এ টাকা আদায় করব।'
আমিনুর রহমান বলেন, "সরকার রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতেই নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে। কেউ যদি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নগদ সহায়তা নিয়ে থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই অপরাধ। কেউ জাল কাগজপত্র দিয়ে নগদ সহায়তা দাবি করলে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তা বোঝার উপায় থাকে না। শাখা ব্যবস্থাপক হয়তো ভালো ক্লায়েন্ট হিসেবে 'অন গুড ফেইথ' তা পরিশোধ করে থাকতে পারে। আর ওই শাখার কেউ যদি এ অপরাধের সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এ ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত কি না তা তদন্তে শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি।"
প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এহসানুল হক বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের তদন্তে ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম পেয়েছে। তবে এটা এখনো আলোচনাসাপেক্ষ। আমরা নিজেরাও তা খুঁজে দেখছি।'
যে প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ববিহীন স্পিনিং মিল দেখিয়ে নগদ সহায়তা নিয়েছে তাদের জালিয়াত বলতে রাজি নন এম এহসানুল হক। তিনি বলেন, 'যে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে এ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে আমরা তাদের সঙ্গেও কথা বলছি। কাজেই যেখানে আলোচনা এখনো চলছে, সেখানে এ নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত কথা বলবেন বলে জানান এম এহসানুল হক।'
এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আলমের মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে আবার ফোন করা হলে সংযোগটি বন্ধ পাওয়া যায়। http://www.dailykalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Tourist&pub_no=555&cat_id=1&menu_id=13&news_type_id=1&index=4
Comments
Post a Comment