অনিয়মের আখড়া ফ্যাস ফাইন্যান্স ভুয়া চেকে ঋণ সমন্বয় *ভুতুড়ে খাতে ব্যয় *অদৃশ্য ব্যক্তির নামে বেতন-ভাতা প্রদান
এ যেন 'সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা!' আর্থিক খাতের খুব কম অনিয়মই আছে, যা ঘটেনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিডালিটি অ্যাসেটে। কম্পানির টাকায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জুতা কেনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কাজে বিদেশ ভ্রমণ, বারের বিল পরিশোধ, অদৃশ্য কর্মকর্তার নামে বেতন উত্তোলন, অস্তিত্ব নেই এমন খাতে বিনিয়োগ দেখানো, ভুয়া চেক দিয়ে ঋণ সমন্বয়_সবই হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাম্প্রতিক তদন্তে বের হয়ে এসেছে ফিডালিটি অ্যাসেট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ (ফ্যাস) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের উদ্যোক্তা পরিচালকদের প্রাথমিক বিনিয়োগ, ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ আর আমানতকারীদের সঞ্চয় নিয়ে নয়ছয় করার কাহিনী। এসব ঘটেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর হাত ধরেই। তবে এসব অপকর্মে পরিচালনা পর্ষদের কারো কারো জড়িত থাকার আলামতও পেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তকারীরা। এ ছাড়া ঋণখেলাপির তথ্য গোপন ও অসত্য তথ্য প্রদান, হদিসবিহীন কর্মকর্তার নামে ঋণ, ঋণগ্রহীতার পক্ষে পরিচালকের থার্ড পার্টি মর্টগেজ প্রদান, ভুতুড়ে খাতে ব্যয় প্রদর্শন, বিধি লঙ্ঘন করে বৃহৎ ঋণ প্রদানের মতো অনিয়ম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
এমডির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এন এস কবির একসঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন এবং উভয় স্থান থেকেই বেতন গ্রহণ, বিধিবহির্ভূত চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ, ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিল প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদান, বিধিবহির্ভূত গাড়ি সুবিধা গ্রহণ, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অর্থে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণ, ক্লাবের ব্যক্তিগত মেম্বারশিপ ফি প্রতিষ্ঠান থেকে
প্রদানের মতো গুরুতর অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়েছেন।
একসঙ্গে দুটি পদে দায়িত্ব গ্রহণ এবং উভয় প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন গ্রহণের বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, '২০১০ সালের ৩ অক্টোবর ফ্যাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের পক্ষ থেকে এন এস কবিরকে ফ্যাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের একজন প্রতিনিধিত্বকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ফ্যাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বপালন শুরু করেন এবং মাসিক এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা হিসেবে ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার লাখ ৬৫ হাজার টাকা বেতন সুবিধা গ্রহণ করেন।' এ বিষয়ে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, 'একসঙ্গে আর্থিক লাভযুক্ত একাধিক চাকরিতে বহাল থাকা গুরুতর অনিয়ম, বিধিবহির্ভূতভাবে গৃহীত এরূপ আর্থিক সুবিধা নিয়মানুযায়ী ফেরতযোগ্য এবং সর্বোচ্চ নির্বাহীর এরূপ দায়িত্বহীন আচরণ শৃঙ্খলাবহির্ভূত ও অগ্রহণযোগ্য।'
এমডি এন এস কবিরের বিধিবহির্ভূত চিকিৎসার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, '২০১০ সালের বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি তাঁর অনুমোদিত চিকিৎসা ভাতা সাড়ে ১৩ হাজার টাকার অতিরিক্ত এক লাখ ২০ হাজার ৫১১ টাকা চিকিৎসা সুবিধা নিয়েছেন।...সর্বোচ্চ পর্যায়ে এরূপ দুর্নীতি ও নিয়মবহির্ভূত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ প্রতিষ্ঠানটির চরম আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারের শামিল।'
এমডির ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিল প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদানের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'প্রতিষ্ঠানটির আপ্যায়ন ও বিজনেস প্রমোশন খাতের খরচগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁর তিনটি ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে আপ্যায়ন খাতে বিল পরিশোধ বাবদ মোট দুই লাখ ৬০ হাজার ৫৩৪ টাকা এবং বিজনেস প্রমোশন খাতে দুই লাখ ৩৫ হাজার ৫০৭ টাকা ব্যয় করেছেন। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে তিনি আলমাস সুপার শপ, পিৎজা হাট, গ্রানিসকাসহ বিভিন্ন শপিং মলের বিল প্রদান, বিভিন্ন ক্লাব ও বারের বিল প্রদান, জুতা ক্রয়, মোবাইল বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন খরচ সম্পাদন করেছেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত খরচ। যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২০০৬ সালে জারি করা ১ নম্বর সার্কুলারের ৪ নম্বর ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।'
প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বক্ষণিক মাত্র একটি গাড়ি ব্যবহারের কথা থাকলেও বিধি লঙ্ঘন করে মোহাম্মদ এন এস কবির প্রতিষ্ঠানের তিনটি গাড়ি ব্যবহার করতেন। প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদ সভার অনুমোদন ছাড়াই তিনি কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, স্পেন, সুইডেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত ও ভুটানে ২০০৯ সালে সাতবার এবং ২০১০ সালে পাঁচবার ভ্রমণ করেছেন। বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্য হিসেবে বিজনেস প্রমোশনের কথা বলা হলেও আইন অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো বৈদেশিক ব্যবসাই করতে পারে না। এমনকি যেসব দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন, সেসব দেশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ব্যবসায়িক যোগাযোগও নেই। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, 'এ ধরনের বৈদেশিক ভ্রমণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে অননুমোদিত ও যথেচ্ছভাবে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানের খরচে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রতিষ্ঠানের বিপুল আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছেন, যা হিসাবায়নপূর্বক তাঁর কাছ থেকে আদায়যোগ্য। শুধু তা-ই নয়, গুলশান ক্লাবের সদস্য হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানের ফি, সাবস্ক্রিপশন ও ডোনেশন খাত থেকে মেম্বারশিপ ফি বাবদ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সার্কুলার এবং তাঁর নিয়োগবিধির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।' ভুতুড়ে কর্মকর্তার নামে ঋণ : প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টিপু সুলতান, নসিব লাইলা, সুলতান এম সাহাবুদ্দিন ও হাবিবুর রহমান অপু নামের মোট চার কর্মকর্তাকে ২০১০ সালে পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার টাকা বেতন দিয়েছে ফ্যাস। তবে তাঁদের কারোরই নিয়োগ ফাইল দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগ। এমনকি প্রতিষ্ঠানের হাজিরা বইয়েও তাঁদের কারো নাম নেই। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'উলি্লখিত ব্যক্তিদের কোনো ফাইল বা ব্যক্তিগত নথি না থাকার বিষয়টি অস্তিত্ববিহীন কর্মচারীর নামে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণবাহী, যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অগোচরে অন্য কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম অচিন্তনীয়, ব্যাপক দুর্নীতি ও অসততার পরিচয় বহন করে। যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩-এর ৩৭ নম্বর ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।'
তথ্য জালিয়াতি : পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এক প্রতিষ্ঠানের দুই কোটি ৬৮ লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ টাকার একটি চেক ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে জমা দেখিয়ে হিসাবটিকে অশ্রেণীকৃত রাখা হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির বিবরণীতে দেখা যায়, চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এভাবেই প্রত্যাখ্যাত চেক ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের খেলাপি ঋণ কম দেখিয়েছে ফ্যাস ফাইন্যান্স লিমিটেড। চেকটি ছিল এলিয়েন কমার্শিয়াল ভেহিকলস করপোরেশনের অনাদায়ী কিস্তি পরিশোধ বাবদ গ্রিনল্যান্ড ডিজাইন কনসালট্যান্টের নামে। একই সঙ্গে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান এলিয়েন কমার্শিয়াল ভেহিকলস করপোরেশনের ঋণও খেলাপি দেখানো হয়নি। একই প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ঘটনা ২০১০ সালের মার্চ কোয়ার্টারে ঘটিয়েছে ফ্যাস ফাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ। তখন ফ্যাস ফাইন্যান্সের কাছে ডেনিম করপোরেশনের জামানত বাবদ থাকা ব্ল্যাংক চেক ব্যবহার করে এলিয়েনের নামে দুই কোটি ১০ লাখ ৮৯ হাজার ৫৫২ টাকা অশ্রেণীকৃত দেখানো হয়।
এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জামানত হিসেবে সংরক্ষিত চেক অপব্যবহার করে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা দেখিয়ে ঋণ অশ্রেণীকৃত রাখা হয়েছে, যা গুরুতর অপরাধ।'
তৃতীয় পক্ষের নামে ঋণ : প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ফ্যাস থেকে ঋণগ্রহীতা খন্দকার গোলাম মহিউদ্দিনের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল হক ও তাঁর স্ত্রী খাইরুন হক থার্ড পার্টি মর্টগেজ করেছেন, যা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গোপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগে দাখিল করা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণের প্রতিবেদনে সৈয়দ সিরাজুল হকের এ মর্টগেজের কোনো উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'এরূপ অসত্য তথ্য দাখিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩-এর ৪১ ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।'
ভুতুড়ে ব্যয় প্রদর্শন : কানাডার সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই, অথচ কানাডা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য ফি বাবদ এক লাখ টাকা প্রদান করেছে ফ্যাস। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকদলের কাছে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো মেম্বারশিপ সার্টিফিকেটও দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। উপরোক্ত চেম্বার ছাড়াও আরো অনেক চেম্বার অব কমার্সকে চাঁদা দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চেম্বার অব কমার্সে এরূপ চাঁদা প্রদান নজিরবিহীন। এ ধরনের চাঁদা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো পক্ষের কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বার্থ জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহের উদ্রেক করে।' ফ্যাস ফাইন্যান্সের মোট মূলধনের পরিমাণ ৯৫ কোটি ৫০ হাজার টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না নিয়েই এর সাবসিডিয়ারি ফ্যাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টকে ১০৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে তার মূলধনের ৩০ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না। অথচ ফ্যাস ফাইন্যান্স এ ক্ষেত্রে তার মূলধনের ১০৯.৩৩ শতাংশ টাকা ঋণ দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাম্প্রতিক তদন্তে বের হয়ে এসেছে ফিডালিটি অ্যাসেট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ (ফ্যাস) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের উদ্যোক্তা পরিচালকদের প্রাথমিক বিনিয়োগ, ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ আর আমানতকারীদের সঞ্চয় নিয়ে নয়ছয় করার কাহিনী। এসব ঘটেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর হাত ধরেই। তবে এসব অপকর্মে পরিচালনা পর্ষদের কারো কারো জড়িত থাকার আলামতও পেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তকারীরা। এ ছাড়া ঋণখেলাপির তথ্য গোপন ও অসত্য তথ্য প্রদান, হদিসবিহীন কর্মকর্তার নামে ঋণ, ঋণগ্রহীতার পক্ষে পরিচালকের থার্ড পার্টি মর্টগেজ প্রদান, ভুতুড়ে খাতে ব্যয় প্রদর্শন, বিধি লঙ্ঘন করে বৃহৎ ঋণ প্রদানের মতো অনিয়ম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
এমডির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এন এস কবির একসঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন এবং উভয় স্থান থেকেই বেতন গ্রহণ, বিধিবহির্ভূত চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ, ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিল প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদান, বিধিবহির্ভূত গাড়ি সুবিধা গ্রহণ, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অর্থে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণ, ক্লাবের ব্যক্তিগত মেম্বারশিপ ফি প্রতিষ্ঠান থেকে
প্রদানের মতো গুরুতর অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়েছেন।
একসঙ্গে দুটি পদে দায়িত্ব গ্রহণ এবং উভয় প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন গ্রহণের বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, '২০১০ সালের ৩ অক্টোবর ফ্যাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের পক্ষ থেকে এন এস কবিরকে ফ্যাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের একজন প্রতিনিধিত্বকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ফ্যাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বপালন শুরু করেন এবং মাসিক এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা হিসেবে ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার লাখ ৬৫ হাজার টাকা বেতন সুবিধা গ্রহণ করেন।' এ বিষয়ে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, 'একসঙ্গে আর্থিক লাভযুক্ত একাধিক চাকরিতে বহাল থাকা গুরুতর অনিয়ম, বিধিবহির্ভূতভাবে গৃহীত এরূপ আর্থিক সুবিধা নিয়মানুযায়ী ফেরতযোগ্য এবং সর্বোচ্চ নির্বাহীর এরূপ দায়িত্বহীন আচরণ শৃঙ্খলাবহির্ভূত ও অগ্রহণযোগ্য।'
এমডি এন এস কবিরের বিধিবহির্ভূত চিকিৎসার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, '২০১০ সালের বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি তাঁর অনুমোদিত চিকিৎসা ভাতা সাড়ে ১৩ হাজার টাকার অতিরিক্ত এক লাখ ২০ হাজার ৫১১ টাকা চিকিৎসা সুবিধা নিয়েছেন।...সর্বোচ্চ পর্যায়ে এরূপ দুর্নীতি ও নিয়মবহির্ভূত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ প্রতিষ্ঠানটির চরম আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারের শামিল।'
এমডির ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিল প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদানের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'প্রতিষ্ঠানটির আপ্যায়ন ও বিজনেস প্রমোশন খাতের খরচগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁর তিনটি ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে আপ্যায়ন খাতে বিল পরিশোধ বাবদ মোট দুই লাখ ৬০ হাজার ৫৩৪ টাকা এবং বিজনেস প্রমোশন খাতে দুই লাখ ৩৫ হাজার ৫০৭ টাকা ব্যয় করেছেন। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে তিনি আলমাস সুপার শপ, পিৎজা হাট, গ্রানিসকাসহ বিভিন্ন শপিং মলের বিল প্রদান, বিভিন্ন ক্লাব ও বারের বিল প্রদান, জুতা ক্রয়, মোবাইল বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন খরচ সম্পাদন করেছেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত খরচ। যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২০০৬ সালে জারি করা ১ নম্বর সার্কুলারের ৪ নম্বর ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।'
প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বক্ষণিক মাত্র একটি গাড়ি ব্যবহারের কথা থাকলেও বিধি লঙ্ঘন করে মোহাম্মদ এন এস কবির প্রতিষ্ঠানের তিনটি গাড়ি ব্যবহার করতেন। প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদ সভার অনুমোদন ছাড়াই তিনি কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, স্পেন, সুইডেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত ও ভুটানে ২০০৯ সালে সাতবার এবং ২০১০ সালে পাঁচবার ভ্রমণ করেছেন। বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্য হিসেবে বিজনেস প্রমোশনের কথা বলা হলেও আইন অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো বৈদেশিক ব্যবসাই করতে পারে না। এমনকি যেসব দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন, সেসব দেশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ব্যবসায়িক যোগাযোগও নেই। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, 'এ ধরনের বৈদেশিক ভ্রমণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে অননুমোদিত ও যথেচ্ছভাবে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানের খরচে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রতিষ্ঠানের বিপুল আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছেন, যা হিসাবায়নপূর্বক তাঁর কাছ থেকে আদায়যোগ্য। শুধু তা-ই নয়, গুলশান ক্লাবের সদস্য হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানের ফি, সাবস্ক্রিপশন ও ডোনেশন খাত থেকে মেম্বারশিপ ফি বাবদ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সার্কুলার এবং তাঁর নিয়োগবিধির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।' ভুতুড়ে কর্মকর্তার নামে ঋণ : প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টিপু সুলতান, নসিব লাইলা, সুলতান এম সাহাবুদ্দিন ও হাবিবুর রহমান অপু নামের মোট চার কর্মকর্তাকে ২০১০ সালে পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার টাকা বেতন দিয়েছে ফ্যাস। তবে তাঁদের কারোরই নিয়োগ ফাইল দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগ। এমনকি প্রতিষ্ঠানের হাজিরা বইয়েও তাঁদের কারো নাম নেই। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'উলি্লখিত ব্যক্তিদের কোনো ফাইল বা ব্যক্তিগত নথি না থাকার বিষয়টি অস্তিত্ববিহীন কর্মচারীর নামে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণবাহী, যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অগোচরে অন্য কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম অচিন্তনীয়, ব্যাপক দুর্নীতি ও অসততার পরিচয় বহন করে। যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩-এর ৩৭ নম্বর ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।'
তথ্য জালিয়াতি : পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এক প্রতিষ্ঠানের দুই কোটি ৬৮ লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ টাকার একটি চেক ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে জমা দেখিয়ে হিসাবটিকে অশ্রেণীকৃত রাখা হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির বিবরণীতে দেখা যায়, চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এভাবেই প্রত্যাখ্যাত চেক ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের খেলাপি ঋণ কম দেখিয়েছে ফ্যাস ফাইন্যান্স লিমিটেড। চেকটি ছিল এলিয়েন কমার্শিয়াল ভেহিকলস করপোরেশনের অনাদায়ী কিস্তি পরিশোধ বাবদ গ্রিনল্যান্ড ডিজাইন কনসালট্যান্টের নামে। একই সঙ্গে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান এলিয়েন কমার্শিয়াল ভেহিকলস করপোরেশনের ঋণও খেলাপি দেখানো হয়নি। একই প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ঘটনা ২০১০ সালের মার্চ কোয়ার্টারে ঘটিয়েছে ফ্যাস ফাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ। তখন ফ্যাস ফাইন্যান্সের কাছে ডেনিম করপোরেশনের জামানত বাবদ থাকা ব্ল্যাংক চেক ব্যবহার করে এলিয়েনের নামে দুই কোটি ১০ লাখ ৮৯ হাজার ৫৫২ টাকা অশ্রেণীকৃত দেখানো হয়।
এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জামানত হিসেবে সংরক্ষিত চেক অপব্যবহার করে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা দেখিয়ে ঋণ অশ্রেণীকৃত রাখা হয়েছে, যা গুরুতর অপরাধ।'
তৃতীয় পক্ষের নামে ঋণ : প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ফ্যাস থেকে ঋণগ্রহীতা খন্দকার গোলাম মহিউদ্দিনের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল হক ও তাঁর স্ত্রী খাইরুন হক থার্ড পার্টি মর্টগেজ করেছেন, যা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গোপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগে দাখিল করা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণের প্রতিবেদনে সৈয়দ সিরাজুল হকের এ মর্টগেজের কোনো উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'এরূপ অসত্য তথ্য দাখিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩-এর ৪১ ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।'
ভুতুড়ে ব্যয় প্রদর্শন : কানাডার সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই, অথচ কানাডা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য ফি বাবদ এক লাখ টাকা প্রদান করেছে ফ্যাস। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকদলের কাছে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো মেম্বারশিপ সার্টিফিকেটও দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। উপরোক্ত চেম্বার ছাড়াও আরো অনেক চেম্বার অব কমার্সকে চাঁদা দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চেম্বার অব কমার্সে এরূপ চাঁদা প্রদান নজিরবিহীন। এ ধরনের চাঁদা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো পক্ষের কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বার্থ জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহের উদ্রেক করে।' ফ্যাস ফাইন্যান্সের মোট মূলধনের পরিমাণ ৯৫ কোটি ৫০ হাজার টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না নিয়েই এর সাবসিডিয়ারি ফ্যাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টকে ১০৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে তার মূলধনের ৩০ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না। অথচ ফ্যাস ফাইন্যান্স এ ক্ষেত্রে তার মূলধনের ১০৯.৩৩ শতাংশ টাকা ঋণ দিয়েছে।
Comments
Post a Comment