মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে নজর দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক-জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য আগাম মুদ্রানীতি প্রণয়ন

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা দেওয়া এবং দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য আগাম মুদ্রানীতি প্রণয়ন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতির মাধ্যমে প্রত্যাশিত মোট দেশজ আয় (জিডিপি) অর্জনের জন্য প্রকৃত উৎপাদন এবং পণ্যের জোগান বাড়ানোর চেষ্টা চালাবে। অন্যদিকে মূল্যস্টম্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অপচয়ী এবং অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রসার নিরুৎসাহিত করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি হবে সংকুলানমুখী। ঋণ প্রবৃদ্ধি সংকোচনের মাধ্যমে মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে আনা হবে। নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। এ জন্য যে কেউ বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পরামর্শ দেওয়ার ফরম্যাট সংযুক্ত করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং সাড়ে ৭ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতির যে প্রাক্কলন সরকার করেছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ করা হবে। তবে মুদ্রা সরবরাহ ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমান পর্যায়ের চেয়ে কমিয়ে আনা হবে। তবে কমানো হলেও মুদ্রা ও ঋণের জোগান ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট হবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ জোগানের নীতি থাকবে। এক খাতের ঋণ অন্য খাতে ব্যবহার বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কঠোর হবে। বর্তমানে তবে মুদ্রা সরবরাহ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি রয়েছে ২২ শতাংশের মতো। নতুন মুদ্রানীতিতে
আগামী ডিসেম্বর নাগাদ এটি ১৬ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রক্ষেপণ নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বর্তমানে বার্ষিক ঋণ প্রবাহ ২৭ শতাংশের কাছাকাছি। নতুন মুদ্রানীতিতে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রক্ষেপণ আসছে।
আগাম মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান সমকালকে জানান, এ মুহূর্তে অর্থনীতির জন্য যা প্রয়োজন তা মাথায় রেখে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য যে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে সে লক্ষ্যের সঙ্গে নতুন মুদ্রানীতির মিল থাকবে। মুদ্রানীতি হবে বাস্তবানুগ। এদিকে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো প্রকাশনায় আগামীতে মুদ্রানীতি কিছুটা সংকোচনমূলক হবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিজনিত অভিঘাত মোকাবেলার জন্য সম্ভাব্য অপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মুদ্রা সরবরাহ ও বেসরকারি খাতে ঋণ সরবরাহ কমানো। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ভোগের ক্ষেত্রে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অভীষ্ট প্রবৃদ্ধি অর্জনের সঙ্গে যথোপযুক্ত ঋণের প্রবাহ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ দূর করতে কিছুটা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা যৌক্তিক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাড়তি মূল্যস্টম্ফীতির চাপের বিষয়টি সার্বক্ষণিক নজরে রেখে রফতানি প্রবৃদ্ধি ও নতুন বিনিয়োগে গতিশীলতা আনতে প্রবৃদ্ধি সহায়ক নীতি অব্যাহত থাকবে। কৃষি ও এসএমই খাতগুলোতে পর্যাপ্ত অর্থায়নসহ আর্থিক খাতের সেবার আওতায় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ও ঋণনীতি সক্রিয় রাখা হবে। তবে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ থাকবে। বিবাহ ঋণ, বিলাসী পণ্য ক্রয়ে ঋণসহ যে কোনো উদ্দেশ্যে ঋণ প্রবৃদ্ধি নিরুৎসাহিত করা হবে। মূল্যস্টম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ জোরদার এবং ফেরত আসা শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের অর্থ বিনিয়োগের নানা পদক্ষেপ মুদ্রানীতিতে থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি এবং খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত বিভিন্ন পণ্যের মূল্যে তেজীভাব বজায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বেশ বেড়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ভালো হওয়ার পরও বাজারে চালের মূল্য বেড়েছে। গত কয়েক মাস ধরে বার্ষিক গড় মূল্যস্টম্ফীতির হার ৮ শতাংশের বেশি। এসব গতিধারা দেখে মনে হচ্ছে, চলতি অর্থবছরের বাকি মাসগুলোতে মূল্যস্টম্ফীতি বেড়ে যাওয়ার চাপ থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে মূল্যস্টম্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগাম মুদ্রানীতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।




http://www.samakal.com.bd/details.php?news=14&action=main&menu_type&option=single&news_id=166987&pub_no=731&type

Comments