এবার যমজ ঘাটতির পথে বাংলাদেশ


 

চলতি ২০১০-১১ অর্থবছর শেষ হতে আর সপ্তাহ খানেক বাকি নেই। অর্থবছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে অর্থনীতির আশঙ্কাজনক অবস্থাগুলো ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠেছে। তাতে করে অর্থনীতির ইতিবাচক অর্জনগুলো নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে।
প্রবৃদ্ধি দিয়েই শুরু করা যাক। ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ হারে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও উচ্চ হারে মূল্যস্ফীতি যেন সেই অর্জনে ক্ষয় ধরাচ্ছে। মে মাসে এসে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ফলে অর্থবছর শেষে অর্থাৎ জুন মাসে এসে মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই সাড়ে ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকবে না, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। বরং আরও বেড়ে যেতে পারে।
আবার রপ্তানি আয়ের অবস্থাও খুব ভালো। ১১ মাসে ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রথমবারের মতো বার্ষিক রপ্তানি আয় দুই হাজার কোটি ডলার অতিক্রম করে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। অর্থবছরের ১০ মাসের আমদানির যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায় আমদানিও বাড়ছে ৪০ শতাংশের বেশি হারে। এর ফলে বাণিজ্য-ঘাটতি অনেক বেড়ে গেছে। অর্থবছরের ১০ মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৪৩ কোটি ডলার। অথচ গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে (১২ মাসে) মোট ঘাটতি ছিল ৫১৫ কোটি ২০ লাখ ডলার।
প্রবাসী-আয়ের প্রবাহও কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে বা জুলাই-এপ্রিল সময়কালে প্রবাসী-আয় এসেছে ৯৬১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের। আর ১১ মাসে বা জুলাই-মে সময়কালে এসেছে এক হাজার ৬০ কোটি ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। এর মানে হলো, বাংলাদেশের লেনদেনের ভারসাম্য বিশেষত চলতি হিসাবের ভারসাম্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামকটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনিবার্যভাবে এর প্রভাব পড়েছে চলতি হিসাবের ওপর। এর ফলে পাঁচ বছর পর চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্তাবস্থার বদলে ঘাটতি দেখা দিতে যাচ্ছে।
চলতি হিসাবে মূলত কোনো দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব প্রতিফলিত হয়। নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। মোটা দাগে এটায় উদ্বৃত্ত বোঝায় যে নিয়মিত লেনদেনের ক্ষেত্রে দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে বোঝায় যে ঋণ করে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে মূলত আমদানি ব্যয় বেড়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়া ও প্রবাসী-আয় কমে যাওয়ার প্রভাবে চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দিতে যাচ্ছে। প্রাক্কলন করা হচ্ছে যে এই ঘাটতি ১০ থেকে ১৫ কোটি ডলারের মতো হতে পারে। অথচ গত ২০০৯-১০ অর্থবছরেই চলতি হিসাবে ৩৭৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।
চলতি হিসাবের ঘাটতি দেওয়ার ফলে যেটা হবে, সেটা হলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্বৈত বা যমজ ঘাটতি দেখা দেবে। ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশে রাজস্ব তথা বাজেট ঘাটতি হয়ে আসছে। চলতি হিসাবেও ঘাটতি ছিল। তবে গত দশকের শুরু থেকে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্তাবস্থা দেখা দিতে শুরু করে। সর্বশেষ ২০০৪-০৫ অর্থবছরে চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল। ফলে দেশে ছিল যমজ ঘাটতি। ওই বছর চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল জিডিপির দশমিক ৯ শতাংশ। আর বাজেট ঘাটতি ছিল (অনুদান বাদে) জিডিপির ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। এরপর পাঁচ বছর আর চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা যায়নি।
অর্থনীতিতে যমজ ঘাটতি তাই নতুন অর্থবছরে সরকারের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠবে। আর এই উদ্বেগের ক্ষেত্র অনেকটাই সরকার নিজে তৈরি করেছে বা বলা যেতে পারে করতে বাধ্য হয়েছে। সেটা হলো বাজেট ঘাটতি। আগামী অর্থবছরে বাজটে ঘাটতি প্রক্ষেপণ করা হয়েছে জিডিপির ৫ শতাংশ। তবে সরকার যেহেতু শাসন ক্ষমতার মেয়াদের অর্ধেককালে চলে এসেছে, সেহেতু আগামী বছর খরচের চাপ বাড়বে। বিশেষ করে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করার চেষ্টাসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রীয় খরচ বাড়িয়ে সরকার দেখাতে চাইবে যে উন্নয়নের কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা পূরণের বিষয়টিও চলে আসবে। খরচের বহর বাড়লেও রাজস্ব আয়ে চলতি বছরের মতো উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি হবে না। সেটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে ঘাটতি বেড়ে যাবে। আর ঘাটতি অর্থায়ন করতে গিয়ে ব্যাংকঋণ গ্রহণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুরও মনে করেন, বাংলাদেশ দ্বৈত বা যমজ ঘাটতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যমজ ঘাটতি হলেই বিরাট সংকট দেখা দেবে, এমনটি নয়। ভারত দীর্ঘদিন ধরে দ্বৈত ঘাটতি নিয়ে চলছে। যদি বাংলাদেশকে উচ্চ হারে মানে ৭ বা ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হয়, তাহলে এখানেও যমজ ঘাটতি থাকবে। সে ক্ষেত্রে মূল উদ্বেগের বিষয়টি হবে ঘাটতি অর্থায়ন। অর্থাৎ কোত্থেকে ও কী পদ্ধতিতে ঘাটতি মেটানো হচ্ছে, তা দেখতে হবে।’
আহসান মনসুর ব্যাখ্যা করে বলেন, যদি বিদেশি সাহায্য ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে চলতি হিসাবের ঘাটতি মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে। অনিবার্যভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। রিজার্ভ কমে যাবে। আর বিনিময় হার বেড়ে যাবে। মানে ডলারের বিপরীতে টাকার দর আরও কমে যাবে। সে ক্ষেত্রে ডলার ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।
আহসান মনসুর মনে করেন, আগামী অর্থবছরে পদ্মা সেতুর অর্থায়নের জন্য বিদেশি সাহায্য প্রবাহ কিছুটা বাড়বে। তবে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে মাত্র ৬৪ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। বিদেশি বিনিয়োগের এই প্রবাহ বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলারে নিয়ে যেতে পারলে যমজ ঘাটতি কোনো সংকট তৈরি করবে না।
আহসান মনসুর সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আগামী অর্থবছরে একদিকে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেমন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে বিনিময় হারের ওপর বাড়তি চাপ যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। কেননা, উচ্চহারে আমদানির ফলে এখনই রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যায়ে নেমে এসেছে যা কিছুদিন আগে ছিল প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যায়ে।
দেখা যাচ্ছে, যমজ ঘাটতি মোকাবিলাটা বাংলাদেশের জন্য খুব সহজ কাজ হবে না। চলতি হিসাবের ঘাটতি অর্থায়ন তথা লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ কমাতে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ নেওয়ার বিষয়টি অনেক দূর এগিয়েছে। এই ঋণের ঝুঁকির মাত্রাও নেহাত কম নয়।
প্রবাসী-আয় প্রবাহ বাড়ানো একটা ভালো সমাধান হতে পারে। কিন্তু কূটনীতিক সমঝোতায় সরকার সুবিধা করতে পারছে না। আর তাই সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হারাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। নতুন বাজার খুঁজে সেখানে জনশক্তি রপ্তানি করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নতুন বাজার তৈরির চেয়ে পুরোনো বাজার ধরে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ। এত দিনেও সে দিকটায় জোর প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। নতুন বাজারও পাওয়া যায়নি।
বস্তুত যমজ ঘাটতি এড়ানো খুব অসম্ভব কিছু নয়। সে ক্ষেত্রে লক্ষ্যটা হতে হবে চলতি হিসাবের ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা। এটাই হয়তো বাস্তবসম্মত। কেননা, বাজেট ঘাটতি কমানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। বরং আগামী দিনগুলোয় তা আরও বাড়বে।
কিন্তু সরকারিভাবেই আগামী বছরগুলোয় চলতি হিসাবের ঘাটতি বজায় রাখা ও তা বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো দলিল থেকে দেখা যায়, আগামী অর্থবছরে হিসাবের ঘাটতি হবে জিডিপির দশমিক ২০ শতাংশ, যা ২০১২-১৩ অর্থবছরে অব্যাহত থাকবে। তবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেড়ে হবে দশমিক ৩০ শতাংশ; ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দশমিক ৬০ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে এই ঘাটতি অর্থায়ন করতে গিয়ে বড় কোনো বিপর্যয় আসবে না তো?

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-06-25/news/164988

Comments