ব্যাংক মালিকদের সিদ্ধান্ত ॥ আমানতের সুদ কমল ০ সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ_ আমানতে ১২ শতাংশ, শিল্পঋণে ১৫ শতাংশ ০ এলসি খুলতে ১২ শতাংশ

ব্যাংকের আমানত গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদের হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে শিল্পোন্নয়নের ৰেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি রোধেও বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। কারণ আমানত সংগ্রহের ৰেত্রে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ প্রদান করলে শিল্পঋণ বিতরণের ৰেত্রে প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যনত্ম নির্ধারণ করা হতে পারে। যেটি আগে ছিল প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যন্ত। দেশে শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির লৰ্যে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিল্প বিকাশের পাশাপাশি ব্যাপক হারে যাতে এলসি খুলতে ব্যবসায়ীরা সুযোগ পান সে লৰ্যেও সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে ব্যাংকগুলোর মালিক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা। অর্থাৎ রফতানি পণ্যের ঋণের বিপরীতে বা এলসি খুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদের হার ১২ শতাংশই নির্ধারিত থাকবে। এর বেশি কোন ব্যাংক গ্রহণ করতে পারবে না। এ নির্দেশ অমান্য করলে সংশিস্নষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে ব্যাংক মালিকদের শীর্ষ সংগঠনের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরম্নল ইসলাম মজুমদার জনকণ্ঠকে বলেন, শনিবার থেকে বেসরকারী ব্যাংকগুলো ১২ শতাংশের বেশি সুদ দিয়ে ডিপোজিট সংগ্রহ করতে পারবে না। একই সঙ্গে নিত্যপণ্য আমদানির ৰেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত সুদের হার ১২ শতাংশের বেশি আদায় করা যাবে না। কোন ব্যাংক যদি এ নির্দেশ অমান্য করে তাহলে সংশিস্নষ্ট ব্যাংকের বিরম্নদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ ওই ব্যাংকের সঙ্গে আনত্মঃব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকবে। এর অংশ হিসেবে কলমানি থেকে অর্থ প্রদান করা হবে না, এলসি খুলতে সহায়তা করা হবে না এবং পে-অর্ডার অনার করা হবে না। তিনি আরও বলেন, দেশে শিল্পের বিকাশ ঘটাতে, অভ্যনত্মরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শিল্পঋণের ওপর সুদ কমানোর লৰ্যেই সরকারী নির্দেশনা বাসত্মবায়ন করা হয়েছে। এতে শিল্প খাতে বৈপস্নবিক পরিবর্তন আসবে। শিল্পৰেত্রে মন্দাভাব কেটে যাবে; মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি।
বেসরকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠনের (এবিবি) সভাপতি কে. মাহমুদ সাত্তার জনকণ্ঠকে বলেন, বিএবির সিদ্ধানত্মই সকল ব্যাংকে কার্যকর করা হবে। ফলে এখন থেকে কোন ব্যাংক তাদের ডিপোজিট আদায়ের ৰেত্রে কোনভাবেই ১২ শতাংশের বেশি সুদ প্রদান করতে পারবে না। একইভাবে নিত্যপণ্য আমদানির ৰেত্রেও ১২ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করা যাবে না। এ ৰেত্রে কোন ধরনের সার্ভিস চার্জ বা অন্য কোন চার্জ আদায় করা যাবে না। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর এমডি এবং চেয়ারম্যানরা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ৰেত্রে একটি নতুন দিগনত্মের সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের শিল্পের বিকাশ ঘটানো, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং শিল্পঋণের ওপর সুদের হার কমানোর লৰ্যে শনিবার দেশের ব্যাংক মালিক ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সমন্বয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গুলশানস্থ বিএবির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যাংকের আমানত গ্রহণের ৰেত্রে ১২ শতাংশের বেশি সুদ না দেয়ার সিদ্ধানত্ম গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে নিত্যপণ্য আমদানির ৰেত্রেও ঋণের বিপরীতে ১২ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করা যাবে না বলে নির্দেশ দেয়া হয়। দেশের অভ্যনত্মরীণ বিনিয়োগ চাঙ্গা করা, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা দূর এবং শিল্পায়নের লৰ্যে এসব সিদ্ধানত্ম গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন রমজানে বাজারে নিত্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি এবং পণ্যের মূল্য যাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ৰমতার মধ্যে রাখা যায় সংশিস্নষ্ট বিষয় বিবেচনা করেও সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়।
অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএবির ও এঙ্মি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরম্নল ইসলাম মজুমদার সভাপতিত্ব করেন। অন্যদের মধ্যে সংসদ সদস্য ও পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাফিজ মজুমদার এবং এবিবির সভাপতি কে. মাহমুদ সাত্তারসহ ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাফিজ মজুমদার বলেন, ব্যাংকগুলোকে মনিটরিং করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকটা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তবে এটি ধরে বসে থাকলে চলবে না। বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো ঋণ ও আমানত হার (সিডিআর) ৮৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে নিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে কোন ব্যাংকই যাতে আগ্রাসী ব্যাংকিং না করে সে বিষয়েও সংশিস্নষ্ট কতর্ৃপৰকে লৰ্য রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার দেশের শিল্প খাতকে চাঙ্গা করতে ব্যাংকঋণের সুদের হার হ্রাস করার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোর আমানত গ্রহণের ওপর সুদের হার হ্রাস করা হলো, যা দেশের শিল্প বিকাশের ৰেত্রে একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
বৈঠকের সিদ্ধানত্ম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারী ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার ফজলে রশীদ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যাংকে বিএবির সিদ্ধানত্ম বাসত্মবায়নের লৰ্যে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকের সংশিস্নষ্ট সকল কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ ঢাকা ব্যাংক ১২ শতাংশের বেশি সুদ দিয়ে ডিপোজিট সংগ্রহ করবে না। একইভাবে নিত্যপণ্য আমদানির ৰেত্রেও ব্যবসায়ীদের থেকে ১২ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করবে না বলেও তিনি সংশিস্নষ্টদের জানিয়ে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে খন্দকার ফজলে রশীদ জনকণ্ঠকে বলেন, ঢাকা ব্যাংক সব সময় দেশ, মানুষ এবং দেশের অর্থনীতি উন্নয়নের লৰ্যে কাজ করছে। দেশের স্বার্থে যে ধরনের সিদ্ধানত্মই হোক না কেন ঢাকা ব্যাংকের পৰ থেকে তা কার্যকর করা হবে। এখানে কোনভাবেই অবহেলা করা হয় না।
বৈঠকে ব্যাংকিং খাতের অস্থির অবস্থার কথা তুলে ধরে ব্যাংকগুলোর অতিমুনাফা বা আগ্রাসী ব্যাংকিংকে দায়ী করা হয়। কারণ নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকিং করলে ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের অস্থিরতা দেখা দিত না। বৈঠকে বলা হয়, কিছু কিছু ব্যাংকের এমডিরা ব্যাংকের মালিকদের বেশি মুনাফা প্রদান করার লৰ্যে অনৈতিক বা ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এতে একদিকে ব্যাংকগুলো যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে এর একটি বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ প্রবণতা থেকে ব্যাংকের এমডি এবং পরিচালনা পর্ষদকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সূত্রে জানা গেছে, অতিসুদে ব্যাংকঋণ গ্রহণ করে শিল্পকারখানা স্থাপন করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একাধিকবার বৈঠক করেছেন ভুক্তভোগীরা। ব্যবসায়ীদের দাবি এবং দেশের শিল্পকারখানার বিকাশ ঘটানোর লৰ্যে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বিএবির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে বিএবির নেতারা আমদানি পণ্যের বিপরীতে ১২ শতাংশ সুদ নেয়া এবং আমানত গ্রহণের ৰেত্রে কোনভাবেই ১২ শতাংশের বেশি সুদ না দেয়ার পৰে ঐকমত্য পোষণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার ব্যাংকগুলো এমডিদের নিয়ে বৈঠক করে বিএবি। ওই বৈঠকে সরকারকে দেয়া প্রতিশ্রম্নতির বাসত্মবায়ন করা হয়েছে।
আমানত গ্রহণের ৰেত্রে সুদের হার ১২ শতাংশ করায় শিল্প খাত এবং মূল্যস্ফীতিতে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনত্মব্য করেছেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমদ চৌধুরী। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের সামগ্রিক আর্থিক উন্নয়নের জন্য সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। শনিবারের বিএবি এবং এবিবি এ দু'টো সংগঠন মিলে যে সিদ্ধানত্ম নিয়েছে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। কারণ ব্যাংকগুলো কম সুদে ডিপোজিট গ্রহণ করলে তা আবার কম সুদেই ল্যান্ডিং করবে। ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে কম খরচে উৎপাদন বাড়াতে পারবে। এতে দ্রব্যমূল্যের দাম কমে আসবে। মানুষের নাগালের মধ্যেই দ্রব্যমূল্য থাকবে। ফলে মূল্যস্ফীতিও হ্রাস পাবে।
উলেস্নখ্য, দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ ব্যাংক পাগলা ঘোড়ার মতো আমানত সংগ্রহের জন্য ছুটছিল। ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহের ৰেত্রে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যনত্ম হারে সুদের আমানত সংগ্রহ করত। কিন্তু শনিবার আমানত গ্রহণের ৰেত্রে বিএবি এবং এবিবির বেধে দেয়া ১২ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করায় ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা অনেকটা কমে আসবে বলেও অর্থনীতিবিদরা মনত্মব্য করেছেন।


http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2011-06-19&ni=62243

Comments