সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ধস * বিক্রির চেয়ে রিপেমেন্ট বেশি হয়েছে * সঞ্চয়পত্রের টাকা চলে যাচ্ছে ব্যাংকে * লৰ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার শঙ্কা

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। সুদের হার কমানো, কর প্রদান করা এবং একাধিক ব্যাংক ও সঞ্চয়বু্যরোর অধিকাংশ কর্মকর্তার অবহেলার কারণেই এটি হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে অর্থ বিনিয়োগ না করে গ্রাহকরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চ হার সুদে ডিপোজিট রাখছেন। ফলে দ্রম্নত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ায় অর্থবছরের লৰ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে না বলেও বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন।
তবে ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আগামীতে কিছুটা বাড়তে পারে বলেও সংশিস্নষ্টরা মন্তব্য করেছেন। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের স্বার্থ রৰা এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করেই বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১১-১২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ছয় হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লৰ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) মাত্র দুই হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল নয় হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে আশঙ্কাজনকভাবে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করার অন্যতম কারণ পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনের সঞ্চয়পত্র ছাড়া বাকি সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎস কর কাটার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। এর ফলে যে কোন অঙ্কের মুনাফা করলে তার ওপর বিগত বছরের ১ জুলাই থেকে ১০ শতাংশ উৎস কর কেটে রাখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার দুই থেকে দেড় শতাংশ পর্যনত্ম কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে সুদের হার অস্বাভাবিকহারে বেড়ে গেছে। কোন কোন ব্যাংক মেয়াদী আমানত সংগ্রহের ৰেত্রে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যনত্ম সুদ দিচ্ছে। যার ফলে বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর তা বিনিয়োগ করা হচ্ছে পুঁজিবাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে।
সরকার চলতি অর্থবছরে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হয়। এটাই সরকারের জন্য কাল হয়েছে। এই করারোপ ও সুদের হার কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকহারে কমে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে নীট বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৭৩.৫৩ শতাংশ। শুধু তাই নয়, নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় চলে গেছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। অর্থবছরের দশ মাসে মাত্র দুই হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে সঞ্চয়পত্রে। আর লৰ্যমাত্রা ছিল সাত হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। এ ৰেত্রে লৰ্যমাত্রা পূরণ নাও হতে পারে বলেও বিশেস্নষকরা মনত্মব্য করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওয়া তথ্য মতে, গত মার্চ মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়েছে ৭৮১ কোটি ৯ হাজার টাকা। আর এপ্রিল মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬১৬ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমেছে ১৬৫ কোটি টাকা। এছাড়া এপ্রিল মাসে রিপেমেন্ট করা হয়েছে ৭৪৪ কোটি টাকা। আর এর আগের মে মাসে রিপেমেন্ট করা হয় ৭৮৭ কোটি টাকা।
জানা গেছে, এপ্রিল মাসে প্রকল্প অনুসারে ৫ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়েছে ৯০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্র ভাঙ্গিয়ে অর্থ নেয়া হয়েছে (রিপেমেন্ট) ১৫৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। পরিবার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৫৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর রিপেমেন্ট করা হয়েছে ২৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তিন বছর মেয়াদী মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়েছে ৭০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। পাশাপাশি রিপেমেন্ট করা হয়েছে ৪০১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। একইভাবে পেনশন সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয় ১২০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং গ্রাহকদের রিপেমেন্ট করা হয়েছে ১০১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এছাড়া অন্যান্য সঞ্চয়পত্র রিপেমেন্ট করতে সব বিলিয়ে প্রায় ৭৪৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
জানা গেছে, চার মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, সকল সফসিলী ব্যাংক, পোস্ট অফিস এবং জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়। তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে অধিকাংশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট অব্যাহত থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের স্ক্রিপ্ট (চেকবই) ও লোকবল সঙ্কটসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এছাড়া প্রায় সবধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়ানো হয়েছিল। এসব কারণেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমান কমে গেছে। একই সঙ্গে রিপেমেন্টের হার বাড়ছে। তবে সরকার এসব দিক বিশেস্নষণ করে ২০১১-১২ অর্থবছরে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার ৫ শতাংশ হ্রাস করার নিদ্ধানত্ম নিয়েছে। গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সংসদে তার বাজেট বক্তৃতায় এসব তথ্য তুলে ধরেন।
পরিবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও একাধিক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বেসরকারী এবং বিদেশী ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে পিছিয়ে যাচ্ছে। পরিবার সঞ্চয়পত্রের বিক্রির অনাগ্রহের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক খতিয়ে দেখে সংশিস্নষ্ট সকল ব্যাংকের সঙ্গে খুব শীঘ্রই বৈঠক করবে। পাশাপাশি এ সঞ্চয়পত্র বিক্রি করার লৰ্যে গ্রাহকদের হয়রানি বন্ধে সাকর্ুলার জারি করা হবে বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানা গেছে।
জানা গেছে, ১৮ বছরের উর্ধে মহিলারা পরিবার সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের জন্য নির্ধারিত ফর্মে আবেদন করতে পারবেন। একক নামে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ক্রয় করতে পারবেন। কোনভাবেই যৌথনামে পরিবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা যাবে না। পাঁচ বছর মেয়াদী পরিবার সঞ্চয়পত্রে মাসিক ভিত্তিতে (১ লাখ টাকায়) ১ হাজার টাকা মুনাফা প্রদান করা হবে। তবে মেয়াদ পূর্তির আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙ্গালে বছরভিত্তিক প্রদানকৃত সুদের টাকা আসল থেকে বাদ যাবে।
৫ বছর মেয়াদের মধ্যে প্রথম বছরের জন্য ৮ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরের জন্য ৯ শতাংশ, তৃতীয় বছরের জন্য ১০ শতাংশ, চতুর্থ বছরে ১১ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের ৰেত্রে ১২ শতাংশ হারে সুদ প্রদান করা হচ্ছে।
পোস্ট অফিস এবং সঞ্চয়পত্র বু্যরো মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা না করার ফলে সাধারণ মানুষ সরকারী, বেসরকারী এবং বিদেশী ব্যাংকগুলোতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে আনাগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সঞ্চয়পত্রে সুদরে হার কম থাকায় আগের চেয়ে বিনিয়োগ অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগর ওপর কিছুটা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার এখন থেকে বিনিয়োগ বাড়তে পারে বলেও সংশিস্নষ্টরা মনে করছেন।
http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=34&dd=2011-06-13&ni=61599

Comments