বাকিংহাম প্যালেসে যাচ্ছে বাংলাদেশের সিরামিক টেবিলওয়্যার * সিরামিক টেবিলওয়্যারের অর্ডার বাড়ছে * রফতানি প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশ * ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশী টেবিলওয়্যার

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী সিরামিক পণ্যের কদর বাড়ছে। প্রতিযোগী মূল্য এবং উচ্চমানের কারণে বাংলাদেশী সিরামিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুরস্ক ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে এ পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ থেকে সিরামিক পণ্য রফতানি লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের দশ মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সিরামিক পণ্য রফতানিতে ১৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। সবচেয়ে আনন্দের খবর হচ্ছে, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের পর এবার ব্রিটেনের বাকিংহাম প্যালেসে যাচ্ছে বাংলাদেশের সিরামিক টেবিলওয়্যার।
এ প্রসঙ্গে ফার সিরামিকের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার উদ্দিন ফরহাদ বলেন, 'আমাদের সিরামিট পণ্য ব্রিটেনের রাজ পরিবার পছন্দ করেছে। তাই বাকিংহাম প্যালেসে ৩৬ হাজার পিস ফার টেবিলওয়্যার রফতানির অর্ডার পেয়েছে। এছাড়া ভারতের গবর্নর হাউস এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশী সিরামিক পণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য গৌরবের। বিশেষ করে ফার সিরামিকের জন্য আরও গৌরবের এ কারণে যে, ওই সকল স্থানে আমাদের সিরামিকের টেবিলওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের উপহার হিসাবে দিচ্ছেন ফার সিরামিকের উচ্চমান ও ডিজাইনের পণ্য।
তিনি বলেন, ডেরেনহাম, মার্কস এন্ড স্পনসরের মতো বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রেতাদের আউটলেটগুলোতে বাংলাদেশী টেবিলওয়্যার স্থান পাচ্ছে।
মূলত চীনে শ্রম মজুরি বেড়ে যাওয়ায় চীন থেকে সিরামিক পণ্যের রফতানি অর্ডার বাংলাদেশে স্থানানত্মরিত হচ্ছে। এছাড়া বৈশিক মন্দা কেটে যাওয়ায় উন্নত দেশগুলো থেকেও প্রচুর পরিমাণ সিরামিক পণ্যের অর্ডার আসছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তাই তাদের কারখানা উৎপাদন ৰমতা সম্প্রসারিত করছেন। কিন্তু কারখানা সম্প্রসারিত করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন ব্যাংক ঋণের সুদের হার নিয়ে। হঠাৎ করে ব্যাংক ঋণের সুদের হার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্যোক্তাদের কাছে বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। এতে উদ্যোক্তারা নিরম্নৎসাহিত হচ্ছেন নতুন ঋণ নিতে।
জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশী সিরামিক পণ্য রফতানি হচ্ছে। এরমধ্যে নতুন বাজার হচ্ছে তুরস্ক ও আর্জেন্টিনা। তুরস্কে তিন লাখ পিস ফার সিরামিক রফতানি হচ্ছে। নতুন বাজার সৃষ্টির পাশাপাশি রফতানির পরিমাণও বাড়ছে। এ কারণে সিরামিক পণ্য রফতানিতে ১৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থবছরের দশ মাসে রফতানি লৰ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
চলতি অর্থবছরে সিরামিক পণ্য রফতানির মোট লৰ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন কোটি ৩৮ লাখ মার্কিন ডলার। ইতোমর্ধে অর্থবছরের দশ মাসে জুলাই-এপ্রিল সময়ে সিরামিক পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে তিন কোটি সাত লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা লৰ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি এবং গত অর্থবছরের একই সময়ের রফতানির আয়ের চেয়ে ১৮.৪৪ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে সিরামিক পণ্য রফতানি হয়েছিল দুই কোটি ৫৯ লাখ ৭০ হাাজার ডলার। আর গত অর্থবছরে সিরামিক পণ্য রফতানি করে মোট আয় হয়েছিল তিন কোটি সাত লাখ ৮০ হাজার ডলার।
বিশ্ব বাজারে সিরামিক পণ্য রফতানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আগামী ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটে এ শিল্পের কাঁচামালের শুল্ক তিন শতাংশ করার প্রসত্মাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ শিল্পের কাঁচামালের ওপর পাঁচ শতাংশ হারে শুল্ক ধার্য রয়েছে। এবং এঙ্সেরিজের ওপর শুল্ক রয়েছে ২৫ শতাংশ পর্যনত্ম। আবার মূলধন যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক রয়েছে তিন শতাংশ। উদ্যোক্তারা এ শিল্পের এঙ্সেরিজ আমদানির ওপর শুল্ক হার মূলধন যন্ত্রপাতির মতো তিন শতাংশ করার প্রসত্মাব করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ইফতেখার উদ্দিন ফরহাদ বলেন, এ শিল্পের কাঁমাচাল মূলত খনিজ পদার্থ, যা আমদানির সময় প্রচুর ময়েশ্চার থাকে। ফলে এর অপচয়ের পরিমাণও অনেক বেশি। প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যনত্ম। এক টন কাঁচামাল আমদানির পর দেখা যায়, অর্ধেক টেকে। অথচ এক টনের ওপরই শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হয়। ভ্যাট রিফান্ডের নির্দেশনা থাকলেও তা আমরা পাই না। এই ভ্যাট রিটার্ন নিতে গেলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, গ্যাস সঙ্কট এ শিল্পের প্রধান সমস্যা। গ্যাস সঙ্কটের কারণে বিদ্যমান কারখানাগুলোর প্রায় ৩০ শতাংশ ৰমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এতে পণ্যের মানও ঠিক রাখা যাচ্ছে না। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজট সমস্যা। দেশের বেশিরভাগ শিল্প কারখানা গাজীপুরে অবস্থিত। ওই শিল্প অঞ্চলে প্রায় নয় হাজার শিল্প কারখানা রয়েছে। কিন্তু গাজীপুরে যেতে আসতেই ছয় ঘণ্টা চলে যায়।
এ প্রসঙ্গে ইফতেখার উদ্দিন ফরহাদ বলেন, এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর চৌরাসত্মার দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। অথচ এই পথটুকু যেতে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। এতে প্রতিবছর প্রায় দু'শ' থেকে তিন শ' কোটি ম্যান আওয়ার নষ্ট হয়। সরকার এই যানজট সমস্যার সমাধানের জন্য ১৪শ' কোটি টাকা ব্যয়ে এয়ারপোর্ট থেকে গাজিপুর পর্যনত্ম রাসত্মা ছয় লেন করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই রাসত্মা ছয় লেন করেও কোন লাভ হবে না। ছয় লেন করতে যে খরচ হবে সেই একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ফ্লাইওভার করা যেতে পারে। আর এটা করলে চার বছরেই খরচের ওই অর্থ উঠে আসবে।
তিনি বলেন, সিরামিক শিল্পে দৰ শ্রমিক সঙ্কট চলছে। বর্তমানে দেশের গস্নাস ও সিরামিক ইনস্টিটিউট থেকে যারা পাস করে বের হচ্ছে তারা কেউ কাজ জানে না। ফলে এ শিল্পের দৰতা সঙ্কট দূর হচ্ছে না। অথচ চীন ও থাইল্যা-ে সিরামিকের ওপর পড়াশোনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
উলেস্নখ্য, বর্তমানে দেশে ২৩টি সিরামিক টেবিলওয়্যার কারখানা আছে। এরমধ্যে ১২টি ছোট। এবং ১১টি বড়। এ সকল শিল্পের বার্ষিক উৎপাদন ৰমতা ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এ শিল্প বর্তমানে মোটি বিনিয়োগের পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা। ১৭ হাজার শ্রমিক এ শিল্পে কাজ করছে। এ শিল্প খাত থেকে সরকার প্রতিবছর রাজস্ব পাচ্ছে প্রায় পাঁচ শ' কোটি টাকা। এ শিল্প শুধু রফতানি আয়েই অবদান রাখছে না, বার্ষিক সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় দু'শ' কোটি টাকার ওপর।



http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=34&dd=2011-05-26&ni=59795

Comments