নিয়ন্ত্রণহীন আগ্রাসী ব্যাংকিং, আর্থিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব ০ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধ অমান্য ০ লাগামহীন বেতনভাতা ০ আইএমএফের উদ্বেগ
দেশে আগ্রাসী ব্যাংকিং চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক বিধিনিষেধ অমান্য করেই এটি করছেন একাধিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের জন্য এমডিদের লাগামহীন বেতন-ভাতা, বোনাস এবং অতিরিক্ত সুবিধাদী দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের অনৈতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠলেও এটি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ব্যাংকগুলো হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ এবং অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, 'আমার সময় ব্যাংকগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বেতন প্রদানে বাধা দেয়া হয়েছে। কারণ এমডিদের বেশি বেতন দিলে তারা, অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য আগ্রাসী ব্যাংকিং বা অনৈতিক ব্যাংকিং করবে, যা সংশিস্নষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনবে।
আইএমএফের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সম্প্রতি আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অতিমুনাফা অর্জনের লোভে আগ্রাসী ব্যাংকিং করতে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও ভালভাবে খতিয়ে দেখতে পারে। আনত্মর্জাতিক এ সংগঠনের উদ্বেগের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১১ সালকে ব্যাংকিংয়ের জন্য মুনাফা অর্জন নয়, ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা বা মূলধন শক্তিশালীকরণের বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের ৩ নম্বর সাকর্ুলারে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী নিয়োগের বিধিবিধান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বেতন-ভাতা প্রদানের ৰেত্রে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, কর্মকা-ের ব্যাপকতা, ব্যবসার পরিমাণ ও উপার্জন ৰমতা, সংশিস্নষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা, বয়স ও অভিজ্ঞতা এবং সমপর্যায়ের অন্যান্য ব্যাংকের অনুরূপ পদে নিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রদত্ত বেতন-ভাতা বিবেচনা করতে হবে। মূলবেতন ও বাড়িভাড়া খাতে প্রত্যৰ বেতন এবং অন্যান্য খাতে ভাতা সমন্বয়ে মোট বেতন নিরূপণ করা হবে। অন্যান্য সুবিধার ৰেত্রে প্রভিডেন্ড ফান্ড, ইউটিলিটি বিল, লিভ-ফেয়ার এ্যাসিস্ট্যান্স, গাড়ি, জ্বালানি, ড্রাইভারের বেতর পাবেন। তবে বোনাস পাবেন না। কিন্তু ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬ নম্বর সাকর্ুলারে এমডিদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা ঠিক রেখে এর সঙ্গে নতুন করে উৎসাহ বোনাস ১০ লাখ টাকা যোগ করা হয়েছে। মূল বেতনের ৰেত্রে তেমন কোন নির্ধারিত নির্দেশনা দেয়া হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। ফলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ তাদের ইচ্ছামতো অতিরিক্ত বেতেন দিয়ে এমডি নিয়োগ দিচ্ছে। আর এমডিরা আগ্রাসী ব্যাংকিং করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ দেশে-বিদেশী ব্যাংক এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতন হলো দেশের বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর বেতন তুলনামূলক অনেক কম। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সর্বসাকল্যে বেতন হলো সাড়ে ৩ লাখ টাকা। আর সবচেয়ে বেশি বেতন রয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। তাঁর বেতন হলো ৯ লাখ টাকার ওপরে। এছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতন ৪ লাখ টাকা থেকে শুরম্ন করে ৯ লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এসব বেতন-ভাতার মধ্যে আবার বিভিন্ন ধরনের বোনাস ও ইনক্রিমেন্টও রয়েছে। এ ধরনের অতিরিক্ত বেতন-ভাতার পর আবার বছরে ১০ লাখ টাকা করে বোনাস দেয়া হচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
একাধিক ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তারা জনকণ্ঠকে জানান, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অতি মুনাফা আদায় করার লৰ্যে লাগামছাড়া বেতন দিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করে। নিয়োগের সময় তাঁরা ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফা করার টার্গেটও বেঁধে দেন। কোন ব্যাংকের এমডি যদি নির্দিষ্ট টার্গেট অনুযায়ী মুনাফা করতে না পারেন তাহলে তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে সংশিস্নষ্ট এমডি প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে অনৈতিক বা আগ্রাসী ব্যাংকিং কার্যক্রমও পরিচালনা করছেন। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে অতিসুদ আদায়, আমানত রেশিওর তুলনায় বেশি ঋণ বিতরণ, শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ করাসহ কলমানি থেকে অর্থ ধার নিয়ে কার্য পরিচালনা করছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিহ্নিত করে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি একাধিক ব্যাংকের নতুন ব্রাঞ্চ খোলার অনুমতিও বন্ধ করে দিয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সময় দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যাতে করে বিশ্বমন্দার মতো যদি ভয়াবহ কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা প্রতিরোধ করে ব্যাংকিং খাত যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংক মন্দা মোকাবেলা করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে দেশের আর্থিক খাতসহ ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো তাদের বিপদ ডেকে আনছে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়সহ ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বৃদ্ধি করে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করার জন্য ইতোমধ্যেই নির্দেশ দিয়ে সব তফসিলী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু এমডিদের বেতন-ভাতা, বোনাস এবং অন্যান্য সুবিধা হ্রাস করতে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ তাদের ইচ্ছামতো ক্যাটাগরিতে বেতন দিয়ে এমডি নিয়োগ দিচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় আমেরিকাসহ একাধিক দেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বেশি ৰতিগ্রসত্ম হয়েছে। ওইসব দেশে প্রায় প্রতিদিনই একটি করে ব্যাংক বন্ধ হয়েছে। এর মূল কারণ হলো ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ব্যয়। ওইসব দেশের ব্যাংকগুলো অধিক মুনাফা করার জন্য কর্মকর্তাদের অত্যধিক বেতন, ভাতা, মুনাফার অংশ এবং বোনাসসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রদান করত। যার ফলে ব্যাংকের লাভের চেয়ে অনেকটা বেশিই ব্যয় হয়েছিল। বাংলাদেশেও এ ধরনের পরিস্থিতি লৰ্য করা যাচ্ছে। কারণ এখানে ব্যাংকগুলোতেও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মাত্রাতিরিক্ত বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। যেটি নিয়ে সংশিস্নষ্ট মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে সংশিস্নষ্ট সব ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতন-ভাতা কমানোর জন্যও আনেক আগে থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এক দফায় এমডিদের বেতন কমানো হয়েছে। এরপরও বর্তমানে যে পরিমাণ বেতন-ভাতা রয়েছে তা নিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করে নির্বাহী পরিচালক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম জনকণ্ঠকে বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের এমডিদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও বোনাস প্রদান করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে। যাতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি সমন্বয় হয়।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের প্রেৰাপটে ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতন কাঠামোর ৰেত্রে একটি সাধারণ গাইডলাইন দেয়া উচিত। যাতে পরিচালনা পর্ষদ তাদের ইচ্ছামতো বেতন-ভাতা প্রদান করে এমডিদের পরিচালনা করতে না পারে। তবে এ গাইডলাইনটি আবার ফিঙ্ড করে দেয়া উচিত নয়।
এমডিদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও বোনাসের কথা উলেস্নখ করে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম আমিনুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, এমডিদের অতিরিক্ত বেতন প্রদান করলে তাঁদের আবার অতিরিক্ত মুনাফাও করতে হয়। ফলে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে অথর্াৎ আগ্রাসী ব্যাংকিং করে অধিক মুনাফা অর্জন করে পরিচালকদের প্রদান করেন। এতে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ব্যাংকগুলোর বেতন-ভাতা প্রদান করা উচিত। কিন্তু বর্তমানে দেয়া হচ্ছে এর অনেক বেশি, যা ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ৰতি। এটি পরিবর্তন দরকার।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল হামিদ জনকণ্ঠকে বলেন, এমডিদের অতিরিক্ত বেতনের কারণেই ব্যাংকগুলো আইন বঙ্গ করে শেয়ারবাজারে যাচ্ছে। অতিসুদে ঋণ দিচ্ছে ও নিচ্ছে। পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে লেনদেন করছে। যার মূল কারণ হলো সংশিস্নষ্ট ব্যাংকটিকে বেশি মুনাফা করে দিতে হবে। কারণ বেশি মুনাফা করতে না পারলে ওই এমডির বেতন বা চাকরি চলে যাবে। ফলে দেশের অর্থনীতির মধ্যে একটি অস্থিরতা বিরাজ করছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিবেচনা করে দেখতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের অর্থ হলো ডিপোজিটরদের অর্থ। তাই ডিপোজিটরদের অর্থ দিয়ে তো একজনকে অতিরিক্ত বেতন ভাতা প্রদান করতে পারেন না। তিনি বলেন, একজনের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান করলেই সে শুধু ভালো কাজ করবে তা নয়, কাজ করার জন্য তার প্রতিশ্রম্নতির পাশাপাশি টিম ওয়ার্ক থাকাও দরকার। এছাড়া ব্যাংকের একজনের বেতন হবে ১০ লাখ আর অন্যরা ১০ হাজার তা হতে পারে না। ব্যাংকের বেতন কাঠামো প্রদানের ৰেত্রে উচ্চ ও সর্বনিম্নর মধ্যে একটি সমন্বয় থাকা দরকার। তিনি বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এমডিদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান করে তাদের কার্য হাসিল করার জন্য। কিন্তু এতে সংশিস্নষ্ট পরিচালকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও শেয়ারহোল্ডারদের কোন লাভ হচ্ছে না। এমডিরা শুধু বেতনই পাচ্ছেন না, এর সঙ্গে বোনাস, ভাতা, মালী, ড্রাইভার, পিয়নসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগসুবিধা পাচ্ছেন। ফলে বর্তমানে যে বেতন কাঠোমো রয়েছে তা পরিহার করা উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছা করলে এটি কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমেরিকায় যে আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছিল সেজন্য ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও বোনাস বা মুনাফার অংশই দায়ী।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, 'আমার সময় ব্যাংকগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বেতন প্রদানে বাধা দেয়া হয়েছে। কারণ এমডিদের বেশি বেতন দিলে তারা, অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য আগ্রাসী ব্যাংকিং বা অনৈতিক ব্যাংকিং করবে, যা সংশিস্নষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনবে।
আইএমএফের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সম্প্রতি আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অতিমুনাফা অর্জনের লোভে আগ্রাসী ব্যাংকিং করতে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও ভালভাবে খতিয়ে দেখতে পারে। আনত্মর্জাতিক এ সংগঠনের উদ্বেগের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১১ সালকে ব্যাংকিংয়ের জন্য মুনাফা অর্জন নয়, ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা বা মূলধন শক্তিশালীকরণের বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের ৩ নম্বর সাকর্ুলারে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী নিয়োগের বিধিবিধান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বেতন-ভাতা প্রদানের ৰেত্রে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, কর্মকা-ের ব্যাপকতা, ব্যবসার পরিমাণ ও উপার্জন ৰমতা, সংশিস্নষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা, বয়স ও অভিজ্ঞতা এবং সমপর্যায়ের অন্যান্য ব্যাংকের অনুরূপ পদে নিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রদত্ত বেতন-ভাতা বিবেচনা করতে হবে। মূলবেতন ও বাড়িভাড়া খাতে প্রত্যৰ বেতন এবং অন্যান্য খাতে ভাতা সমন্বয়ে মোট বেতন নিরূপণ করা হবে। অন্যান্য সুবিধার ৰেত্রে প্রভিডেন্ড ফান্ড, ইউটিলিটি বিল, লিভ-ফেয়ার এ্যাসিস্ট্যান্স, গাড়ি, জ্বালানি, ড্রাইভারের বেতর পাবেন। তবে বোনাস পাবেন না। কিন্তু ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬ নম্বর সাকর্ুলারে এমডিদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা ঠিক রেখে এর সঙ্গে নতুন করে উৎসাহ বোনাস ১০ লাখ টাকা যোগ করা হয়েছে। মূল বেতনের ৰেত্রে তেমন কোন নির্ধারিত নির্দেশনা দেয়া হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। ফলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ তাদের ইচ্ছামতো অতিরিক্ত বেতেন দিয়ে এমডি নিয়োগ দিচ্ছে। আর এমডিরা আগ্রাসী ব্যাংকিং করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ দেশে-বিদেশী ব্যাংক এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতন হলো দেশের বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর বেতন তুলনামূলক অনেক কম। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সর্বসাকল্যে বেতন হলো সাড়ে ৩ লাখ টাকা। আর সবচেয়ে বেশি বেতন রয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। তাঁর বেতন হলো ৯ লাখ টাকার ওপরে। এছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতন ৪ লাখ টাকা থেকে শুরম্ন করে ৯ লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এসব বেতন-ভাতার মধ্যে আবার বিভিন্ন ধরনের বোনাস ও ইনক্রিমেন্টও রয়েছে। এ ধরনের অতিরিক্ত বেতন-ভাতার পর আবার বছরে ১০ লাখ টাকা করে বোনাস দেয়া হচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
একাধিক ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তারা জনকণ্ঠকে জানান, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অতি মুনাফা আদায় করার লৰ্যে লাগামছাড়া বেতন দিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করে। নিয়োগের সময় তাঁরা ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফা করার টার্গেটও বেঁধে দেন। কোন ব্যাংকের এমডি যদি নির্দিষ্ট টার্গেট অনুযায়ী মুনাফা করতে না পারেন তাহলে তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে সংশিস্নষ্ট এমডি প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে অনৈতিক বা আগ্রাসী ব্যাংকিং কার্যক্রমও পরিচালনা করছেন। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে অতিসুদ আদায়, আমানত রেশিওর তুলনায় বেশি ঋণ বিতরণ, শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ করাসহ কলমানি থেকে অর্থ ধার নিয়ে কার্য পরিচালনা করছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিহ্নিত করে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি একাধিক ব্যাংকের নতুন ব্রাঞ্চ খোলার অনুমতিও বন্ধ করে দিয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সময় দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যাতে করে বিশ্বমন্দার মতো যদি ভয়াবহ কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা প্রতিরোধ করে ব্যাংকিং খাত যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংক মন্দা মোকাবেলা করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে দেশের আর্থিক খাতসহ ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো তাদের বিপদ ডেকে আনছে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়সহ ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বৃদ্ধি করে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করার জন্য ইতোমধ্যেই নির্দেশ দিয়ে সব তফসিলী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু এমডিদের বেতন-ভাতা, বোনাস এবং অন্যান্য সুবিধা হ্রাস করতে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ তাদের ইচ্ছামতো ক্যাটাগরিতে বেতন দিয়ে এমডি নিয়োগ দিচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় আমেরিকাসহ একাধিক দেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বেশি ৰতিগ্রসত্ম হয়েছে। ওইসব দেশে প্রায় প্রতিদিনই একটি করে ব্যাংক বন্ধ হয়েছে। এর মূল কারণ হলো ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ব্যয়। ওইসব দেশের ব্যাংকগুলো অধিক মুনাফা করার জন্য কর্মকর্তাদের অত্যধিক বেতন, ভাতা, মুনাফার অংশ এবং বোনাসসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রদান করত। যার ফলে ব্যাংকের লাভের চেয়ে অনেকটা বেশিই ব্যয় হয়েছিল। বাংলাদেশেও এ ধরনের পরিস্থিতি লৰ্য করা যাচ্ছে। কারণ এখানে ব্যাংকগুলোতেও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মাত্রাতিরিক্ত বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। যেটি নিয়ে সংশিস্নষ্ট মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে সংশিস্নষ্ট সব ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতন-ভাতা কমানোর জন্যও আনেক আগে থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এক দফায় এমডিদের বেতন কমানো হয়েছে। এরপরও বর্তমানে যে পরিমাণ বেতন-ভাতা রয়েছে তা নিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করে নির্বাহী পরিচালক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম জনকণ্ঠকে বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের এমডিদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও বোনাস প্রদান করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে। যাতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি সমন্বয় হয়।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের প্রেৰাপটে ব্যাংকগুলোর এমডিদের বেতন কাঠামোর ৰেত্রে একটি সাধারণ গাইডলাইন দেয়া উচিত। যাতে পরিচালনা পর্ষদ তাদের ইচ্ছামতো বেতন-ভাতা প্রদান করে এমডিদের পরিচালনা করতে না পারে। তবে এ গাইডলাইনটি আবার ফিঙ্ড করে দেয়া উচিত নয়।
এমডিদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও বোনাসের কথা উলেস্নখ করে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম আমিনুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, এমডিদের অতিরিক্ত বেতন প্রদান করলে তাঁদের আবার অতিরিক্ত মুনাফাও করতে হয়। ফলে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে অথর্াৎ আগ্রাসী ব্যাংকিং করে অধিক মুনাফা অর্জন করে পরিচালকদের প্রদান করেন। এতে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ব্যাংকগুলোর বেতন-ভাতা প্রদান করা উচিত। কিন্তু বর্তমানে দেয়া হচ্ছে এর অনেক বেশি, যা ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ৰতি। এটি পরিবর্তন দরকার।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল হামিদ জনকণ্ঠকে বলেন, এমডিদের অতিরিক্ত বেতনের কারণেই ব্যাংকগুলো আইন বঙ্গ করে শেয়ারবাজারে যাচ্ছে। অতিসুদে ঋণ দিচ্ছে ও নিচ্ছে। পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে লেনদেন করছে। যার মূল কারণ হলো সংশিস্নষ্ট ব্যাংকটিকে বেশি মুনাফা করে দিতে হবে। কারণ বেশি মুনাফা করতে না পারলে ওই এমডির বেতন বা চাকরি চলে যাবে। ফলে দেশের অর্থনীতির মধ্যে একটি অস্থিরতা বিরাজ করছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিবেচনা করে দেখতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের অর্থ হলো ডিপোজিটরদের অর্থ। তাই ডিপোজিটরদের অর্থ দিয়ে তো একজনকে অতিরিক্ত বেতন ভাতা প্রদান করতে পারেন না। তিনি বলেন, একজনের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান করলেই সে শুধু ভালো কাজ করবে তা নয়, কাজ করার জন্য তার প্রতিশ্রম্নতির পাশাপাশি টিম ওয়ার্ক থাকাও দরকার। এছাড়া ব্যাংকের একজনের বেতন হবে ১০ লাখ আর অন্যরা ১০ হাজার তা হতে পারে না। ব্যাংকের বেতন কাঠামো প্রদানের ৰেত্রে উচ্চ ও সর্বনিম্নর মধ্যে একটি সমন্বয় থাকা দরকার। তিনি বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এমডিদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান করে তাদের কার্য হাসিল করার জন্য। কিন্তু এতে সংশিস্নষ্ট পরিচালকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও শেয়ারহোল্ডারদের কোন লাভ হচ্ছে না। এমডিরা শুধু বেতনই পাচ্ছেন না, এর সঙ্গে বোনাস, ভাতা, মালী, ড্রাইভার, পিয়নসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগসুবিধা পাচ্ছেন। ফলে বর্তমানে যে বেতন কাঠোমো রয়েছে তা পরিহার করা উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছা করলে এটি কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমেরিকায় যে আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছিল সেজন্য ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও বোনাস বা মুনাফার অংশই দায়ী।
Comments
Post a Comment