উদ্বিগ্ন বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবি ॥ বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনি সঙ্কেত

জ্বালানি তেল ও খাদ্যদ্রব্যের অব্যাহত মূল্য বৃদ্ধি, স্বর্ণের রেকর্ড মূল্য ও মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধস বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারে উপনীত করেছে। টালমাটাল এ অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
আরব সংঘাত থামানো না গেলে তেলের মূল্য ২০০ ডলারে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছে এডিবি। বিশ্ববাজারে অশোধিত জ্বালানি তেলের অব্যাহত মূল্য বৃদ্ধি এশিয়া প্রশানত্ম মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যেই তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে।
এদিকে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ আশঙ্কা করছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে ধ্বংস হতে পারে ভবিষ্যত প্রজন্ম ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লৰমাত্রা। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্য মানুষের ক্রয়ৰমতার বাইরে চলে যাবে। নতুন করে মন্দা সৃষ্টি হতে পারে। কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না খাদ্য শস্যের দাম । প্রতিদিন নতুন করে দারিদ্র্যের শৃঙ্খল পড়ছে অসংখ্য লোক। ঝু্্ঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে আরও কয়েক লাখ মানুষ। যে কোন সময় তারা হারাতে পারে ক্রয় ৰমতা। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোতে অস্থিরতা দেখা দেবে। এ পরিবারগুলোর সদস্যদের স্বাস্থ্য ও শিৰাব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক ভারসাম্য ৰতিগ্রসত্ম হলে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার আশঙ্কা করছেন বিশ্ব অর্থনীতিবিদরা।
এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক প্রাক্কলন করেছে, খাদ্য ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ৫০ লাখের বেশি মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ওই অঞ্চলে দরিদ্র মানুষ তাদের আয়ের অর্ধেক ব্যয় করে খাদ্যের যোগান দিতে। যদি তাদের পরিবারের খাদ্যের জন্য আরও বেশি ব্যয় করতে হয়, তাহলে পরিবারের জন্য সঞ্চয় অথবা বিনিয়োগের জন্য তহবিলের সামথর্্য সীমিত হয়ে পড়বে।
স্বর্ণের রেকর্ড মূল্য বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য বিনষ্ট করবে। স্বর্ণের মূল্য সপ্তাহের শুরম্ন থেকেই রেকর্ড পর্যায়ে উঠে আসে এবং এই বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়। সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করে বুধবার প্রতি আউন্স স্বর্ণের মূল্য ১৫০৩ ডলারে উন্নীত হয়।
বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি ও ইউরোজোনে ঋণ সঙ্কটের আতঙ্ক, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট, উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা, মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধস এবং থ্রি ইলেভেনে জাপানের ভূমিকম্প ও সুনামির কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ওই মুল্যবান ধাতবের দিকে ঝুঁকছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে আরেক দফা মন্দার উপক্রম হয়েছে।
এছাড়া মুদ্রাস্ফীতির আতঙ্কে রূপার মূল্যও গত ৩১ বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স রম্নপার মূল্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৪৩.৩৭ ডলারে উন্নীত হয়। যা ১৯৮০ সালের পর সবের্াচ্চ। শুুধুমাত্র ২০১১ সালে রম্নপার দাম বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। নিউইয়র্কে এর মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫০.৩৫ ডলারে দাঁড়ায়।
অনেক দেশ তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরণের লৰ্যে স্বর্ণ সঞ্চয় করে থাকে। অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করতে গত বছর বাংলাদেশও এ তালিকায় যুক্ত হয়। বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্যের ৰেত্রে স্বর্ণ একটি গুরম্নত্বপূর্ণ বাহন। আর এ ভারসাম্য বিঘি্নত হলে তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পালস্না দিয়ে বাড়বে মুদ্রাস্ফীতি।
তাছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ক্রমশই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। দেশটির একের পর এক ব্যাংক দেউলিয়া হচ্ছে। ফলে মার্কিন অর্থনীতি খাদের কিনারে এসে পেঁৗছেছে। ১৫ এপ্রিল দেশটির ৬টি ব্যাংকে লালবাতি জ্বলেছে। এ নিয়ে এ বছর ৩৪টি ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষণা করল মার্কিন সরকার। গত বছর দেনার দায়ে বন্ধ হয়েছিল ১৫৭টি ব্যাংক। এর আগের বছর বন্ধ হয়েছিল আরও ১৪০টি ব্যাংক। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের টালমাটাল অবস্থার খেসারত পুরো বিশ্বেই দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেস্নষকরা।
জ্বালানি ও খাদ্য মূল্য বৃদ্ধির কারণে এ বছরের শুরম্ন থেকেই আমেরিকানদের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে বলা হয়, জানুয়ারির চেয়ে ফেব্রম্নয়ারিতে ভোক্তাদের ব্যয় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা জানুয়ারির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। এতে বলা হয়, গত অক্টোবরের পর এটিই ভোক্তাদের ব্যয়ের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ'র পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
ম্যানিলাভিত্তিক এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ওই অঞ্চলের দেশগুলোর ২০১১ সালের বার্ষিক উন্নয়ন প্রতিবেদনে জানায়, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য ও তেলের মূল্য ২০১১ সালে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২০১২ সালে এই হার কমে না আসলে চীন, হংকং, দৰিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট কমে যাবে।
এডিবির মতে, সবচেয়ে বেশি ৰতিগ্রসত্ম হবে সিঙ্গাপুর, ফিলিপিন্স ও তাইওয়ান। এ দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ কমে যাবে। তবে এডিবি জানায়, ওই অঞ্চলে এই অর্থনৈতিক ৰতির মাত্রা হবে মাঝারি ধরনের। চলতি বছর ওই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে ৭ শতাংশ। এডিবি অবশ্য বলেছে, এই অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব পড়বে তেলের জন্য খাদ্যের জন্য নয়। তেলের জন্য ওই অঞ্চলের মুদ্রাস্ফীতি সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পেতে পারে।
চীন ও ভারতের অর্থনীতি অব্যাহতভাবে জোরদার হওয়ায় বাড়তি অশোধিত তেলের চাহিদা দেখা দিয়েছে। এর ফলে মধ্য এপ্রিলের তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ মার্কিন ডলার।
এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যদি তেল রফতানিকারক আরব দেশগুলোর বিশৃঙ্খলা থামানো না যায় তাহলে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ২শ' ডলারে দাঁড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, দৰিণ কোরিয়া, ভারত ও জাপানসহ অনেক দেশের অর্থনীতি আরব দেশগুলোর তেলের ওপর নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ব্যাপক পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরম্নদ্ধারকে পিছিয়ে দিতে পারে বলে আরও একবার সতর্ক করে দেয় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। এ জন্য সংস্থা দুটি মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বাঁচাতে জরম্নরী সহায়তার আহ্বান জানায়। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত দু'টি সংস্থার এক বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক বলেন, আমাদের এ ব্যাপারে পদৰেপ নেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
বিশ্বব্যাংক এর আগে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার পরিস্থিতি অত্যনত্ম খারাপের দিকে যাচ্ছে যা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক বিবৃতিতে বলা হয়, যদি তেলের মূল্য দ্রম্নত বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে অনিশ্চয়তা বাড়বে অথবা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাধাগ্রসত্ম হবে। এতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০১১ ও ২০১২ সালে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৩ ও ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ৰমতা ধরে রাখা তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসকের বিরম্নদ্ধে জানুয়ারিতে বিদ্রোহ শুরম্ন হয় যা একইভাবে মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন ও বাহরাইনে ছড়িয়ে পড়ে উলেস্নখ করে জোয়েলিক বলেন, ওই অঞ্চলের সংস্কারে বিশ্বব্যাংক অবশ্যই সহায়তা দেবে। কারণ বিশ্বের একটি প্রানত্ম ৰতিগ্রসত্ম হলে সমগ্র বিশ্বেই তার প্রভাব পড়বে। এখন বিশ্বায়নের যুগ। তাই বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই গুরম্নত্ব সহকারে দেখতে হবে।


 http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2011-04-22&ni=56367

Comments